পুরাণ এর প্রকৃত পরিচয় - Viral Tender

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বর্তমান সময়ে বেদ এবং পুরাণ এর সম্পর্ক এবং এদের পারস্পরিক সাংঘর্ষিকতার বিষয়টা নিয়ে একটা ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।বেদ এর সাথে পুরাণসমূহের সাংঘর্ষিকতা এবং পুরাণসমূহের প্রচলন বৈদিক সভ্যতার পতন ও বৈদিক ধর্মের অবক্ষয় এর মূল কারন।পুরাণ বলতেই আমরা অধিকাংশ শাস্ত্র না পড়া সহজ সরল হিন্দুরা শিবপুরাণ,বিষ্ণু পুরাণ,ভাগবত পুরাণ এরুপ ৩৬টি প্রচলিত পুরান(১৮টি প্রধান পুরান ও ১৮টি উপপুরান) কে বুঝি।কিন্তু আসলেই কি তাই?






এছাড়া আমাদের এই কথিত ১৮টি পুরান এবং ১৮টি উপপুরান আছে যেগুলো ব্যসদেব কর্তৃক লিখিত বলে প্রচারিত হয়এই আলোচনায় পুরানসমূহের প্রকৃত পরিচয় সম্বন্ধে আলোকপাত করা হবে।
পুরাণসমূহকে পঞ্চম বেদ এর ন্যয় মর্যাদা দেয়া হত।এটা বৈদিক যুগে পুরাণসমূহের গুরুত্বপূর্ন অবস্থান নির্দেশ করে।
শ্রুতিশাস্ত্রে পুরান এর উল্লেখ-

ঋচঃ সামানি ছন্দাংসি পুরাণং যজুসা সহ
উচ্ছিস্টাজ্জজ্ঞিরে সর্বৈ দিবি দেবা দিবিশ্রিত।।
(অথর্ববেদ ১১.৭.২৪)

স বৃহতিম দিশামনুব্য চলৎ।
তমিতিহাসশ্চ পুরাণং চ গাথাশ্চ নারাসংশিশ্চনুব্যাচলৎ।    
ইতিহাসস্য চ বৈস পুরাণস্য চ গাথানাং চ ইতিহাসস্য চ নারাশংসিনং চ প্রিয়ম ধাম ভবতি য এবম বেদ
।।
(অথর্ববেদ ১৫.৬.১১-১২)
অর্থাত্‍ ঋগ,সাম,যজু ও অথর্ববেদ ঈশ্বর কর্তৃক প্রদত্ত,ঠিক তেমন পুরান,ইতিহাস,গাথা,কল্প ও সকল দেবসমূহও(প্রাকৃতিক শক্তি) তাঁর থেকে সৃষ্ট।
ছান্দেগ্য উপনিষদ বলেছে-
"ইতিহাসপুরানাম পঞ্চম বেদানাং বেদহ"
(ছান্দেগ্য উপনিষদ ৭.১.২,৭.১.৪)
অর্থাৎ ইতিহাস পুরানসমূহ যেন পঞ্চম বেদরুপ।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে পুরানসমূহ অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে এবং এগুলো বেদ বুঝতে সহায়ক।
বেদদ্রষ্টা এবং উপনিষদ রচয়িতা মুনিগন(যেমন ছান্দেগ্য উপনিষদ রচয়িত ঋষি উদ্দালক ,সনত্‍কুমার,সান্দিল্য মুনি কর্তৃক) সত্য এবং ত্রেতা যুগে জন্মগ্রহন করেন।
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যসদেব দ্বাপর যুগে জন্মগ্রহন করেন।
উপরের তথ্যগুলো থেকে এটা পরিস্কার যে উল্লেখিত ৩৬ টি পুরাণ যদি ধরেও নিই ব্যাসদেব লিখেছেন(যদিও ভাষাতাত্ত্বিকগণ নিশ্চিত করেছেন ব্যাসদেবের সময়েও এই গ্রন্থগুলোর উৎপত্তি ঘটেনি এবং এদের অনেকেই একদম সমসাময়িক এমনকি ষোড়শ দশকের যেমন ভবিষ্য পুরাণ) তাহলেও বোঝা যায় যে বেদ উপনিষদে যে পুরাণ এর কথা বলা হয়েছে এবং পঞ্চম বেদ নামে প্রশংসা করা হয়েছে তা এই গ্রন্থসমূহ নয় কেননা এই পুরাণসমূহের কথিত রচয়িতা মহর্ষি ব্যাসদেব  বেদদ্রষ্টা ঋষিদের এবং বেদ এর অনেক পরবর্তীকালের লোক।






সুতরাং বেদ এবং উপনিষদ এ উল্লেখিত পুরাণসমূহ বর্তমান এ প্রচলিত ৩৬টি পুরান নয় কেননা তখন ওই গ্রন্থগুলোই ছিলনা এবং তাদের গ্রন্থকারদের জন্ম ই হয়নি।
সুতরাং পুরাণসমূহ যার কথা বেদ এবং উপনিষদ এ উল্লেখিত তা বর্তমানে প্রচলিত ৩৬টি উপনিষদ নয়তাহলে এখন প্রশ্ন হল পুরাণ কোনগুলো যার কথা বেদ ও উপনিষদ এ এত গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে?
মহাভারত এ ব্যসদের বলেছেন বেদ বোঝার জন্য পুরানসমূহ প্রয়োজন-
"তথা হি মহাভারতে মানবিয়ে চ ইতিহাস পুরানাব হ্যম বেদম সমুপব্রহ্ময়েত বিভেয়ি অল্পশ্রুতদ বেদো মম অয়ম
প্রহরীস্যতি ইতি
পুরানাম পুরানাম ইতি চন্যয়ত্র্য
ন চ বেদেন বেদেস্য ব্রহ্মনম সম্ভবতি ন
য অপরিপুর্নস্য কনক
বলয়সি অ ত্রপুনা পূর্নম যুজ্যতে"
(মহাভারত আদি পর্ব,১.২৬৭,২৬৮)
বর্তমানে প্রচলিত পুরানসমূহের মতে ব্যসদেব মহাভারত লেখার ও বহুকাল পরে পুরানসমূহ রচনা করেন।যদি তাই হয়ে থাকে তবে মহাভারত এ পুরান শব্দটি এলো কি করে?কেননা তখন পর্যন্ত তো পুরান বলে তো কিছু ছিলই না!এর মাধ্যমে মহাভারত এ উল্লেখিত পুরান মহাভারত এর আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল।
অর্থাত্‍ বর্তমানে প্রচলিত ৩৬টি পুরান মহাভারত এ উল্লেখিত পুরানসমূহ নয়।
*ঐতরেয়,শতপথ,গোপথ ও সাম-এই চারটি ব্রাহ্মন গ্রন্থ ই হল বেদ,উপনিষদ ও মহাভারত এ উল্লেখিত অতীব গুরুত্বপূর্ন পুরান!
এই চার ব্রাহ্মন গ্রন্থের অপর নামগুলো হল ইতিহাস,পুরান,কল্প,গাথা এবং নরসংশি।
¤যখন ব্রাহ্মন গ্রন্থে বিভিন্ন পুর্বাপর ঘটনা বর্ণিত থাকে তখন তার নাম হয় ইতিহাস(যেমন ঐতেরিয় ব্রাহ্মন এ যাজ্ঞবল্ক্যসহ বিভিন্ন ঋষির ইতিহাস)
¤ব্রাহ্মন গ্রন্থসমূহে যখন সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয় তখন তার নাম হয় পুরান(শতপথ ব্রাহ্মন এর সৃষ্টিতত্ত্ব)
¤যখন বৈদিক শব্দের ব্যকরন ও অর্থ এবং তার ব্যুত্‍পত্তি নিয়ে আলোচনা করা হয় তখন এদের নাম হয় কল্প
¤যেহেতু বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে বিভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে সেহেতু আরেক নাম গাথা।
¤অনেক স্থানে বিভিন্ন কাহিনীর মাধ্যমে ভাল-মন্দের নৈতিক শিক্ষা দেয়া হয়েছে তাই আরেক নাম নরশংশি।
পুরান এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সায়নাচার্য বলেছেন-
"ইদম নৈব কিমছনসিন্নদ রসিতিত্যদিবম।
জগতঃ প্রগনবস্থাম উপক্রম্য স্বর্গপ্রতিপদ একম বাক্যথতম পুরানাম"
(
Aiterya Aranyaka,Sayana bhumika)
অর্থাত্‍ সৃষ্টির পূর্বে শুধু সেই এক ও অদ্বিতীয় ই বিরাজমান ছিলেন।সৃষ্টির পর তাঁর সৃষ্টির তত্ত্ব নিয়ে যেগুলো আলোচনা করল সেগুলো পুরান।
আরো স্পষ্ট করে দিতে এবং মানুষ যাতে দ্বিধায় না ভুগে সেজন্য বলেছেন,
"ন ব্রহ্ম যজ্ঞ প্রকারনেমন্ত্র ব্রাহ্মনব্যতিরেকে ত ইতিহাস্যেভাগ অম্লয়ন্তে"
অর্থাত্‍, ব্রহ্ম যজ্ঞে মন্ত্র উচ্চারন করা হয় যে ব্রাহ্মনসমূহথেকে সেগুলো ব্যতিরেক অন্য কোন গ্রন্থ ই পুরান নয়।
এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে বৈদিক যুগে যজ্ঞের পরে যজমানরা ব্রাহ্মন গ্রন্থসমূহ থেকে সৃষ্টিসুক্ত সমূহ উচ্চারন করত যে কারনে এসব গ্রন্থকে পুরান বলা হত।
তৈত্তিরীয় আরন্যক এর ২.৯ এ স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে-
"য়দ ব্রাহ্মনি ইতিহাস পুরানানি কল্পন গাথা নরসংশি"
অর্থাত্‍ মন্ত্রের বিষয় ভিত্তিতে ব্রাহ্মন গ্রন্থসমূহই পুরান,ইতিহাস,কল্প,গাথা ও নরসংশি নামে পরিচিত।
সুতরাং এটা পরিস্কার যে বেদ,উপনিষদ ও মহাভারতে উল্লেখিত পুরান হল ব্রাহ্মনগ্রন্থসমূহ এবং প্রচলিত ৩৬টি পুরানসমূহ(বিষ্ণু পুরান,নারদিয় পুরান,অগ্নি পুরান,পদ্ম পুরান,গঢ়ুড় পুরান,মার্কন্ডেয় পুরান,শিব পুরান,লিঙ্গ পুরান,স্কন্দ পুরান ইত্যাদি) প্রকৃত পুরান নয়।আরো খেয়াল করে এই পুরানসমূহ পড়লে বোঝা যায় যে নানারকম ভূল,অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তব কাহিনীতে পরিপূর্ন,অশ্লীলতায় ভরা এই বিকৃত পুস্তকসমূহ মোটেও মহর্ষি ব্যসদেব এর লেখা নয় বরং কিছু রুপক গল্পভিত্তিক কাহিনী ও অনেকক্ষেত্রে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মব্যাবসায়ীদের হাতিয়ার মাত্র
সুতরাং সনাতন এর ঐক্যের স্বার্থে এবং বৈদিক ধর্মের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বহীন ও শাস্ত্রমর্যাদাহীন গ্রন্থ আমাদের বর্জন করা উচিত






No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages