যৌতুক প্রথা - Viral Tender

Post Top Ad

Responsive Ads Here

যৌতুক প্রথা

Share This


বিবাহ নামক যে পবিত্র সামাজিক বন্ধনটি মানবসমাজের ভিত্তিকাঠামোরুপে দায়িত্ব পালন করে আসছে দিনের পর দিন সেই শুদ্ধ অনুষ্ঠানটি সুদীর্ঘকাল ধরে বইছে যৌতুক নামক কলঙ্কের এক পাপভার।মানব চরিত্রের যত নিম্নধরনের অবনমন সম্ভব তার মধ্যে যৌতুক বোধহয় নিকৃষ্টতম।

বছরের পর বছর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের মৌলবাদীত্বের,ধরমান্ধতার দিকে এগিয়ে চলার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল শিক্ষাব্যাবস্থায় পাঠ্যপুস্তক এর মেরুকরণ।আমাদের মৌলবাদী শিক্ষাব্যাবস্থার সুবাদে শিক্ষার্থীরা বখতিয়ার খিলজির ১৭ জন সৈন্য নিয়ে বাংলা জয়ের কাল্পনিক কাহিনী জানলেও জানতে পারেনা যে এই ধর্মান্ধ জঙ্গী সেনাপতি ই বাংলা জয় করতে হিন্দু-বৌদ্ধদের প্রতি ঘৃণাস্বরুপ ধংস করে দিয়েছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,মানব সভ্যতার গৌরব প্রখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়।








সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই ভয়াবহ পক্ষপাতমূলক মিথ্যাচারে ভরা পাঠ্যক্রমে ছোটবেলাতেই আমাদের পড়তে হয় যে যৌতুক প্রথা নাকি হিন্দুদের সৃষ্ট!তাদের উদ্দেশ্য একটাই আর তা হল অঙ্কুর থেকেই কোমলমতি হিন্দু শিশুদের নিজ ধর্ম ও সমাজ সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারনা দিয়ে সংখ্যালঘু নির্মূলীকরণ করা।কিন্তু প্রশ্ন হল আমাদের দেশে অন্যান্য ধর্মালম্বীরা বিশেষত সংখ্যাগুরু মুসলিমরা তাহলে যৌতুক নেন কেন?তাদের উত্তরটা হয় এটা হিন্দুদের থেকে দেখে দেখে তারা শিখেছেন!কিন্তু কই,তারা হিন্দুদের থেকে দেখে দেখে ধর্মীয় সহনশীলতা তো শিখতে পারেন নি!তাহলে তো ২৪ দিনে ৩১৯ টি মন্দিরে হামলার মত সংবাদ দেশবাসীকে পড়তে হতনা!আমাদের দেশের ইতিহাসে হিন্দুদের কাছ থেকে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী কোন শিক্ষা আজ পর্যন্ত নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়না,তাহলে প্রিয় বাংলা অন্তত আফগান হবার দিকে এগোতনা!তো তারাই আবার আমাদের কাছ থেকে যৌতুক নেয়া শিখেছেন,ব্যাপারটা একটু ইশপের গল্পের মত হয়ে গেলনা?







আপনাদের একটি চমকপ্রদ তবে স্বাভাবিক তথ্য জানিয়ে রাখা দরকার।আপনারা কি জানেন যে যৌতুক এর জন্য নির্যাতনে সবচেয়ে বেশী নারী মৃত্যু হয় কোনদেশে?দেশটির নাম পাকিস্তান,যেখানে প্রতি বছর যৌতুক এর কারনে নির্যাতিত হয়ে ৩০০০ এর ও বেশী নারী মারা যান।পাকিস্তানের ৮৪ শতাংশ মানুষ ই বিশ্বাস করেন যে যৌতুক ছাড়া নারীর বিয়ে অসম্ভব আর দেশটির ৯৫ শতাংশ বিয়েতেই যৌতুক আদান-প্রদান করা হয়!বিখ্যাত ইসলামিক লেখক A.S Bazmee Ansari তার “হামদর্দ ইসলামিকাস” গ্রন্থে বলেছেন পাকিস্তানে মুসলিমরা যৌতুক কে সুন্নাহ(ইসলামের পালনীয় পুণ্যকর্ম যা নবী করতেন) মনে করে কেননা নবী নাকি তার মেয়ে ফাতিমার বিয়েতে আলীকে এবং পরে আরেক মেয়ে জয়নব এর বিয়েতেও যৌতুক(আরবি ভাষায় জাহেজ) দিয়েছিলেন!বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন সংস্থার কাছে আমার প্রশ্ন,মুসলিম অধ্যুষিত দেশটিতেও কি হিন্দুরা চুপি চুপি গিয়ে তাদের যৌতুক নেয়া শিখিয়ে দিয়ে এসেছিল?






উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে হিন্দু সমাজে যৌতুক প্রথার ইতিহাসটা খুব একটা প্রাচীন নয়।বিশেষত বৈদিক যুগে যখন কিনা নারীরাও পুরুষদের মতই শিক্ষাগত এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক সমঅধিকার লাভ করত তখনকার যুগে এই ধরনের কোন প্রথা ই প্রচলিত ছিলনা।বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক মাইকেল উইটজেল ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত “জার্নাল অব সাউথ এশিয়ান উইমেন” এ বলেন উল্লেখ করেন যে বৈদিক যুগে যৌতুক ও সতী প্রথার অস্তিত্ব ছিলনা।তখনকার সময়ে নারীরা সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার পেত  বলেই বোধহয় এমনটি হত।Dr. Kane বলেন যে এমনকি বৈদিক পরবর্তী যুগেও শুধুমাত্র “অসুর বিবাহ” তে যৌতুক দেয়া হত যে ধরনের বিয়ে হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী নিষিদ্ধ ছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ সালে যখন Alexander  ভারত আক্রমণ করেন তখন ভারতবর্ষের বিদ্যমান নিয়মকানুনের বর্ণনায় কিংবদন্তি গ্রীক ইতিহাসবিদ মেগাস্থেনেস ও আরিয়ান The Invasion of India গ্রন্থে বলেন,
“তারা(প্রাচীন ভারতের অধিবাসীরা) নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে।তারা যৌতুক নেয়না,তারা কেবল কন্যার সৌন্দর্য ও বিভিন্ন গুণগুলোই আমলে নেয়

ইন্ডিকা গ্রন্থে মেগাস্থেনেস ও আরিয়ান বলেন,
“তারা যৌতুক দেয়া বা নেয়া ছাড়াই বিয়ে করে।কন্যার বিয়ের বয়স হলে পিতা তার জন্য মূলত মল্লযুদ্ধ,দৌড় প্রতিযোগিতা বা বিভিন্ন শারীরিক কসরতে পারঙ্গম পাত্র খোঁজে।“

পারস্যের প্রখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক আল-বিরুনী ১০৩৫ সালে রচিত তারিখ-আল-হিন্দ গ্রন্থের  Matrimony in India অধ্যায়ে লিখেছেন,
“বিয়ের দ্রব্যাদি আনন্দের সহিত বিবাহস্থানে আনা হয়।কোন যৌতুক দেয়া নেয়া হয়না।পাত্র পাত্রীকে বিয়ের আগে কিছু উপহার দেয় যা সে কখনো আর ফেরত চাইতে পারবেনা।তবে যে মেয়েকে সে প্রস্তাব দিল সে বিয়ে বাতিল করতে চাইলে টা ফেরত দিতে পারে।“
আল-বিরুনী এও বলেছেন যে তখনকার সময়েও ভারতে হিন্দু নারীরা পিতার সম্পত্তির অধিকারী হত এবং বিয়ের সময় ই তাকে তার সম্পত্তির ভাগ দিয়ে দেয়া হত।    

ঐতিহাসিকদের ধারনা একাদশ শতকের পর ভারতে অসংখ্য মানুষ হত্যার মাধ্যমে জোরপূর্বক ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠার কারনে যে মারাত্মক আর্থ-সামাজিক বিপর্যয় ঘটেছিল তার কারনেই ধীরে ধীরে যৌতুক প্রথার উৎপত্তি ঘটে।আবার অনেকে মনে করেন ষোড়শ শতাব্দীর পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের গোড়াপত্তনের সুত্র ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশে যৌতুক প্রথা বিস্তার লাভ করে।

এক্ষনে হিন্দু ধর্মশাস্ত্রীয় বিধান এর আলোকে যৌতুক এর বিধিনিষেধ আলোচনা করা জরুরী।
যেহেতু বৈদিক যুগে কতিপয় ব্যাতিক্রম ছাড়া যৌতুক প্রথা ছিলনা বললেই চলে সেহেতু হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রে যৌতুক নিয়ে খুব একটা নিষেধাজ্ঞার উদাহরণ মেলেনা।তারপরেও যে অল্প পরিমান যৌতুক এর ঘটনা বিদ্যমান ছিল সেগুলোকে ইঙ্গিত করেই বোধহয় অথর্ববেদ বলছে-

চিত্তিরা উপবর্ধনং চক্ষুরা অভ্যঞ্জনম্।
দৌর্ভুমিঃ কোশ আসীদ্যদযাত্সূর্যা পতিম্ ।।     
অথর্ববেদ ১৪.১.৬
অনুবাদ-ভোরের আলোর ন্যায় শুভ্র কন্যা যখন স্বামীর গৃহে যায় তখন তার নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা ই হল তার আচ্ছাদন,তার ধার্মিকতা,শিক্ষা ই হল তার সাথে আসা স্বামীর জন্য উপহার।

গুরুকুল কাংগ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয়ব্রত বাচস্পতি ব্যাখ্যা করেছেন যেহেতু তখনকার দিনে যেসব বিচ্ছিন্ন যৌতুক এর ঘটনা ঘটত সেসবে দেখা যেত কন্যাকে দামী বস্ত্র ও অলঙ্কারে আচ্ছাদিত করে দেবার কথা বলা হত এবং সঙ্গে উপহারের কথা বলা হত।পবিত্র বেদ সেদিকে নিষেধাজ্ঞার কথা ইঙ্গিত করে বলছে যে কন্যার নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা ই হল তার আচ্ছাদন(বস্ত্র ও অলঙ্কার) আর তার ধার্মিকতা,শিক্ষা এসব হল তার স্বামীর প্রাপ্ত উপহার।

বৈদিক সংস্কৃতিতে বিবাহের সময় কন্যার পিতা বরপক্ষকে নয় বরং বরপক্ষ  সম্মানপূর্ব কন্যার পিতাকে ধন দ্বারা আদৃত করবেন

যাসাং নাদদতে শুলকং জ্ঞাতয়ো   বিক্রয়ঃ।
অর্হণং তৎ কুমারীণামানৃশংস্যঞ্চ কেবলম্।
মনুসংহিতা .৫৪

অনুবাদ-কন্যার পিতা প্রভৃতি আত্মীয়সজন যেখানে কন্যাকে বরপক্ষপ্রদত্ত ধন গ্রহন করে না,সেখানে অপত্য ত্যগ হয় না।কন্যাকে সম্মানপ্রদানপূর্বক বরপক্ষকে কন্যার পিতার 
নিকট এই ধন প্রদান করতে হয়


পিতৃভির্ভ্রাতৃভিশ্চৈতাঃ পতিভির্দেবরৈস্তথা।
পূজ্যা ভূষয়িতব্যশ্চ বহুকল্যাণমীপ্সুভিঃ।
মনুসংহিতা .৫৫

অনুবাদ-তবে বিবাহকালে বরই শুধু কন্যাপক্ষকে কন্যার প্রতি সম্মানপূর্বক ধন দেবেন এমন নয়।বিবাহোত্তর কালে বরের পিতা,ভ্রাতা ইত্যাদি যদি অতুল কল্যানরাশির কামনা করেন তাহলে তারাও কন্যাকে বস্ত্রালঙ্কারাদি দ্বারা ভূষিত করবে!

প্রায়সময় দেখা যেত বিয়ের সময় মেয়ের বাবা-মা এবং আত্মীয়স্বজন মেয়েকে স্নেহবশত বস্ত্র,অলঙ্কারাদি উপহার হিসেবে দিত যাকে “স্ত্রীধন” বলা হয়।মনুসংহিতা বলছে যৌতুক তো দুরের কথা,মেয়ের বর বা বরের আত্মীয়স্বজন কেউ যদি ওই স্ত্রীধন ভোগ করতে চায় তবে তারা চরম দুর্দশাগ্রস্ত হয়।

স্ত্রীধনানি তু যে মোহাদুপজীবন্তি বান্ধবাঃ।
নারীযানানি বস্ত্রং বা তে পাপা যান্ত্যধোগতিম্।।
মনুসংহিতা ৩.৫২

অর্থাৎ কন্যার পিতা,মাতা,ভ্রাতা,আত্মীয়স্বজন কন্যাকে স্নেহবশত যে বস্ত্র-অলঙ্কার,দ্রব্যাদি ইত্যাদি উপহার দেয়(স্ত্রীধন) সেগুলো যদি ছেলের আত্মীয়স্বজন ভোগ করার চেষ্টা করে তাহলে সেই পাপাচারীরা অধোগতি লাভ করে।  

আবার অনেক সম্প্রদায় বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনটিকে একটি মানুষ কেনাবেচার নোংরা পদ্ধতিতে পরিণত করেছে।তারা বিভিন্ন ধরনের মোহরানা পালন করে যার মাধ্যমে তারা নাকি পাত্রীর দাম নির্ধারণ করে!তাদের অনেককে আবার গর্ব করে বলতে শোনা যায় যে এই অর্থ পরিশোধ ছাড়া স্বামী স্ত্রীকে স্পর্শ করতে পারবেনা!কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি একধরনের সমাজস্বীকৃত পতিতাবৃত্তি নয় কি যেখানে ভোগ্যদ্রব্য হিসেবে নারীর দাম নির্ধারণ করা হয়?

আর এ ধরনের বর্বর চিন্তাধারী লোকদের কথা ভেবেই মহর্ষি মনু বলেছেন-

আর্ষে গোমিথুনং শুল্কং কোচিদাহু মৃষৈব তৎ।
অল্পোহপ্যেবৎ মহান্ বাপি বিক্রয়স্তাবদেব সঃ।।
(মনুসংহিতা ৩.৫২)

অনুবাদ-বিবাহের সময় বরের পক্ষ থেকে কনেপক্ষকে যে একজোড়া গরু দেয়া হয় তা কোনভাবেই শুল্ক নয়।কারন কম হোক আর বেশী হোক,শুল্ক হলেই তা ক্রয়-বিক্রয় ই করা হয় কিন্তু আর্য বিবাহ কোন ক্রয়-বিক্রয় নয়,বরং ধর্মকার্য।

আশা করি হিন্দুদের কাছ থেকে শিখতে আগ্রহী অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন এসব মহৎ নীতি ই শিখবেন।
  
শেষে বধু হয়ে আসা নারীর তেজ সম্বন্ধে মনু বলছেন-

যত্র নার্য্যস্ত পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ
যত্রৈতান্ত  পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ।
মনুসংহিতা .৫৬

অনুবাদ-যে বংশে বা পরিবারে স্ত্রীলোকরা সমাদর প্রাপ্ত হন সেখানে সকল শ্রী  কল্যান উপস্থিত থাকে।আর যে বংশে বা পরিবারে স্ত্রীলোকদের সমাদর নেই,সেখানে যজ্ঞ,হোম,আরাধনা সমস্ত ক্রিয়াই নিস্ফল হয়ে যায়!

সুতরাং যৌতুককে না বলুন,একটি সমৃদ্ধ,বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলুন।


1 comment:

  1. এই রকম লেখনির মাধ্যমে সমাচ থেকে যৌতুকের অভিশাপ মোচন করতে হবে । ধন্যবাদ এই রকম চমৎকার লেখার জন্য ।

    ReplyDelete

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages