পবিত্র বেদ ও আমাদের অবহেলা - Viral Tender

Post Top Ad

Responsive Ads Here

পবিত্র বেদ ও আমাদের অবহেলা

Share This


আজ আমরা যারা নিজেদের সনাতন ধর্মাবলম্বী বলে পরিচয় দেই তাদের অনেকেই জানি না আমাদের মূল সম্পর্কে।  আমাদের ধর্মের মূল বা আধার কি? সকল মুনি-ঋষি এক বাক্যে স্বীকার করেছেন বেদ অখিল ধর্মমূলম্ অর্থাৎ আমাদের ধর্মের মূল হচ্ছে বেদ। কিন্তু কলিহত জীব আজ বেদের সংস্পর্শে নেই। বেদ থেকে বহুদূরে চলে গিয়েছি আমরা। বেদকে আমরা বানিয়েছি অস্পৃশ্য, বেদ ছুঁলে নাকি পাপ হবে? বেদ হতে দূরে সড়ে গিয়ে আমরা কলিকেই শক্তিশালী করছি। নানা ধর্মব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে বিভিন্ন কুসংস্কারকেই আমরা আমাদের ধর্মের অঙ্গ বলে মনে করছি। তার উপর বহু মতপথ তো আছেই। কিন্তু বেদ কি বলে? আমরা শিখেছি একে ছুঁতে নেই, ওকে ছুঁতে নেই! কিন্তু কখনো জিজ্ঞেস করে দেখিনি আসলে কি এগুলোই আমাদের ধর্ম বা  বেদের শিক্ষা? এই লেখায় আমি বেদ মন্ত্রের আলোকে কিছু তথ্য বিবৃত করব, যা বেদ সম্বন্ধে প্রচলিত কুসংস্কার সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট দিক নির্দেশ করবে বলে মনে করি।

আজ আমাদের পথভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ আমাদের নিজেদের সম্পর্কে আমাদের নেতিবাচক ভাবনা। আমরা নিজেদের এতই অধম মনে করি যে, আমরা ভাবি বেদের কথা বার্তা আমাদের বোধগম্য হবে না। আসলে এটি যে কতবড় ভুল ধারণা তা এই লেখাটি পড়লে কিছুটা হলেও বুঝতে পারবেন বলে আশা রাখছি।
আসলেই কি আমরা অধম? নাকি আমাদের নিজেদের প্রতিই আমাদের এই নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা আমাদের অধম বানিয়ে রাখছে? বেদ কি বলে? বেদ বলছে,

           উদ্যানং তে পুরুষ নাবয়ানং জীবাতুং তে দক্ষতাতিং কৃণোমি                
আ হি রোহেমম্ অমৃতং সুখং রথমথ জির্বির্বিদথমা বদাসি।।
হে মানুষ ওঠো! ওঠে দাঁড়াও! পতিত হওয়া তোমার স্বভাবজাত নয়। জ্ঞানের আলোকবর্তিকা শুধু মাত্র তোমাকেই দেয়া হয়েছে যা দিয়ে তুমি ঐ সকল অন্ধকূপ এড়িয়ে যেতে পারো 
-অথর্ববেদ ৮/১/৬
    


আপনারা যারা এই মন্ত্রটির অর্থ পড়লেন সত্যি করে বলুন তো কজন এর অর্থ অনুধাবন করতে পারেন নি? যেসব গুরুরা বলে বেদ তোমরা বুঝবে না, প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেরা শুদ্ধভাবে বেদ অধ্যয়ন করেছেন কি না তাই সন্দেহ! আমরা মানুষেরা যদি বেদ না বুঝি তো বেদ কি পশু জাতির জন্য পাঠানো হয়েছে? বৈদিক ঋষিরা স্পষ্টত বলে গিয়েছেন আমরা অধম নই, শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা অর্থাৎ হে বিশ্ববাসী অমৃতের পুত্রেরা শোন, মানে আমরা হচ্ছি অমৃতের পুত্র বা ঈশ্বরের পুত্রতাহলে কি করে আমরা অধম হতে পারি যদি না আমরা নিজেরাই নিজেদের অধম বানিয়ে না রাখি?

     তারপর কেও কেও বলেন ভাগবত পুরাণে আছে স্ত্রীশূদ্রদ্বিজবন্ধূনাং ত্রয়ী ন শ্রুতিগোচরা মানে স্ত্রী, শূদ্র ও পতিত দ্বিজেরা বেদ শ্রবণ করতে পারবে না। আসলেই কি তাই? কিন্তু আমরা তো বেদ পাঠ করলে দেখতে পাই অম্ভিনি কন্যা বাক, লোপামুদ্রা, ঘোষা, মৈত্রেয়ী, গার্গী ইত্যাদি আরও নানা মহিলা ঋষিদের নাম।




বেদ যদি নারীরা শুনতেই না পান তবে বেদের দ্রষ্টা কি করে নারী হলেন? বেদের বিভিন্ন গৃহ্যসূত্রে আছে ইয়ং মন্ত্রঃ পত্নী পঠেৎ অর্থাৎ এই মন্ত্রটি পত্নী পাঠ করবে। নারী বেদ শিক্ষা না পেলে কি করে বেদ মন্ত্র পাঠ করবেন শুদ্ধভাবে? পবিত্র বেদ কি বলে বেদ পাঠ সম্পর্কে? যজুর্বেদ ২৬/২ স্পষ্টত ঘোষণা করছে,
ওঁ য়থেমাং বাচং কল্যাণীমাবদানি জনেভ্যঃ
ব্রহ্ম রাজন্যাভ্যাং শূদ্রায় চার্য়ায় চ স্বায় চারণায় চ।।
প্রিয়ো দেবানাং দক্ষিণায়ৈ দাতুরিহ ভূয়াসময়ং মে কামঃ সমৃধ্যতামুপ মাদো নমতু ।।

অনুবাদ: হে মনুষ্যগন আমি যেরূপে ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য,শূদ্র, স্ত্রীলোক এবং অন্যান সমস্ত জনগনকে এই কল্যাণদায়িনী পবিত্র বেদবাণী বলিতেছি,তোমরাও সেই রূপ কর যেমন বেদবাণীর উপদেশ করিয়া আমি বিদ্বানদের প্রিয় হয়েছি ,তোমরাও সেরূপ হও আমার ইচ্ছা বেদ বিদ্যা প্রচার হোক এর দ্বারা সকলে মোক্ষ এবং সুখ লাভ করুক
                                                                                                                         -যজুর্বেদ ২৬/






     অর্থাৎ পবিত্র বেদ পাঠে কারো কোন বাঁধা নিষেধ নেই। সেজন্যই পূর্বে শূদ্রের ঘরে জন্ম নেয়া ঋষি পেয়েছি আবার মহিলা ঋষিও পেয়েছি।


এরপর অনেক তথাকথিত শিক্ষিত গণ্য মান্য ব্যক্তিগণ বলে থাকেন বেদ ব্যাক ডেটেড, বর্তমান যুগে তা অচল। এটি অত্যন্ত হাস্যকর কথা। সূর্যের বয়স তো পৃথিবীর চেয়ে বেশি, কিন্তু বয়স বেশি বলেই কি সূর্য ব্যাক ডেটেড হয়ে গিয়েছে? বর্তমানে নিত্য নতুন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আমরা সৌরশক্তিকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছি। ঠিক সেভাবেই নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পবিত্র বেদের জ্ঞানকে আমরা আগের চেয়ে আরও কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করতে পারি। সময় গেলেও সূর্যের প্রয়োজনীয়তা যেমন কমে যায়নি, অন্য কোন কিছু যেমন সূর্যের স্থান দখল করতে পারেনি ঠিক তেমনি সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর যুগ চলে গেলেও বেদের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়নি বা অন্য কোন গ্রন্থই বেদ এর স্থান দখল করতে পারবে নাপবিত্র বেদ এর জ্ঞান যে কখনোই পুরনো হয় না তা ঈশ্বর পবিত্র বেদে এই মন্ত্রের মাধ্যমে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন-

অন্তি সন্তং ন জহাত্যন্তি সন্তং ন পশ্যতি।
দেবস্য পশ্য কাব্যং ন মমার ন জীর্য়তি।।
অর্থঃ (অন্তি) নিকটে থাকার পরেও মানুষ (সন্তম্) পরমেশ্বরকে (পশ্যতি ন) দেখতে পায় না, আবার (অন্তি) নিকটে থাকার দরুণ মানুষ (সন্তম্) পরমেশ্বরকে (জহাতি ন) ছাড়তেও পারে না। (দেবস্য) দিব্য গুণ সম্পন্ন পরমাত্মার(কাব্যম্) বেদরূপী কাব্যকে (পশ্য) দেখ (ন মমার) সেই কাব্য কখনও মরেও না অর্থাৎ বাতিল হয় না,  (ন জীর্য়তি) না কখনো পুরাতন বা জীর্ণ হয় অর্থাৎ তা সদা নবীন।
                                                             -অথর্ববেদ ১০/৮/৩২

    



কত সুন্দর উপমার মাধ্যমে ঈশ্বর বলে দিচ্ছেন বেদ যে সদা নবীন, তা কখনো ব্যাক ডেটেড হয় না। বরং অজ্ঞান অন্ধকারে নিমজ্জিত ব্যাক্তিরাই আসুরিক ভাবের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে নিজস্ব সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ দ্বারা বেদের স্থান দখল করার ব্যর্থ প্রয়াস চালান। প্রকৃতপক্ষে তারা এভাবে বেদ বিমুখ হয়ে কলির ফাঁদে পতিত হচ্ছে।




    বর্তমানে আমাদের অন্যতম সমস্যা আমরা এক নেই, আমরা বহু মতপথে বিভক্ত। এরও অন্যতম কারণ আমরা পবিত্র বেদ থেকে সরে এসেছি। পবিত্র বেদের একের উপাসনার পথ পরিত্যাগ করে আমরা হাজার হাজার উপাস্য ও উপাসনার পদ্ধতি তৈরি করে নিয়েছি। এর ফলে আমরা দেখতে পাই, সনাতনীরা দিনদিন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। আমরা বেদ বাদ দিয়ে পুরাণের মন ভুলানো কাহিনী দ্বারা প্ররোচিত হচ্ছি। কেও ভাগবত পুরাণ পড়ে কৃষ্ণকে ঈশ্বর বলছে, তো কেও বিষ্ণু পুরাণ পাঠ করে বিষ্ণুকে ঈশ্বর ও কৃষ্ণকে বিষ্ণুর অবতার বলে দাবী করছে। পদ্ম পুরাণ পড়ে কেও মনে করছে শৈবরা সব নরকে যাবে, তো শৈবরা তাদের শিব পুরাণ ও লিঙ্গ পুরাণ এমনকি মহাভারতে কৃষ্ণ দ্বারা শিবের উপাসনা দেখিয়ে কৃষ্ণ উপাসকদের হেয় করছে। অন্যদিকে শাক্তরা চুপ থাকবে কেন? তারাও মার্কণ্ডেয়, দেবী ভাগবত ও কালিকা পুরাণ এনে দেখিয়ে দিচ্ছে বিষ্ণু, শিব, ব্রহ্মা, কৃষ্ণ সবাই মহামায়ার শক্তির প্রকাশ, সকলের মূল সেই আদ্যাশক্তি মহামায়া। এরকম গানপত্য, রাম ভক্ত, সূর্য উপাসক সবাই নিজ নিজ সাম্প্রদায়িক পুস্তক তুলে ধরে নিজের উপাস্যকে মনিব ও অন্যের উপাসকদের দাসানুদাস বানিয়ে ছাড়ছে। সকলেই সনাতন ধর্মের মূল বেদকে বাদ দিয়ে নিজ নিজ তথাকথিত শাস্ত্র নিয়ে পড়ে আছে, অথচ প্রত্যেকেই নিজেদের দাবী করছে সনাতনী হিন্দু। অথচ আমরা যদি বেদের দিকে তাকাই তবে দেখতে পবিত্র বেদ বিশুদ্ধ এক ঈশ্বরের উপাসনার কথাই বলে। বেদ আমাদের বলছে এক মতে, এক পথে চলতে। এই কথা বললেই কতিপয় লোক বলে উঠেন যে বেদে নাকি কেবল অগ্নি, ইন্দ্র ইত্যাদি নামের বহু দেবতার উপাসনার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারা জানেই না ইন্দ্র কে, অগ্নি কে? পবিত্র বেদ স্বয়ং আমাদের বলছে-


ইন্দ্রং মিত্রং বরুণমগ্নিমাহুরথো দিব্যঃ স সুপর্ণো গরুত্মান্।
            একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি অগ্নিং য়মং মাতরিশ্বানামাহুঃ।।
      (ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৪৬)
অনুবাদ- সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমসত্য ঈশ্বরকে জ্ঞানীগন বিভিন্ন নামে অবহিত করে থাকেন,কেউ অগ্নি,কেউ ইন্দ্র,কেউ যম,কেউ বরুণ,কেউ গরুত্মান কেউবা মাতরিশ্বা 
  
!
অর্থাৎ বেদ বহু দেব নয় এক ঈশ্বরকেই বহু নামে সম্বোধন করেছে। আর আমাদের বহু মত পথে বিভক্তি সম্পর্কে পবিত্র বেদ বলছে-
সং গচ্ছধ্বং সং বদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্।
দেবা ভাগং য়থা পূর্বে সংজানানা উপাসতে।। ২ 
সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্।
সমানং মন্ত্রমভি মন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বো হবিষা জুহোমি। ৩
সমানী ব আকুতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।
সমানমস্তু বো মনো য়থা বঃ সুসহাসতি।। ৪
(ঋগবেদ ১০/১৯১/২-৪)
অনুবাদ- হে মনুষ্য! তোমরা একসঙ্গে চল, একসঙ্গে মিলে আলোচনা কর, তোমাদের মন উত্তম সংস্কার যুক্ত হোক। পূর্বকালীন জ্ঞানী পুরুষেরা যেরূপ কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করেছে তোমরাও সেরূপ কর। তোমাদের সকলের মন্ত্র এক হোক, মিলনভূমি এক হোক, মন এক হোক, সকলের চিত্ত এক হোক। তোমাদের সকলকে একই মন্ত্রে সংযুক্ত করেছি, তোমাদের সকলের জন্য অন্ন ও উপভোগ একই প্রকারে দিয়েছি। তোমাদের সকলের লক্ষ্য সমান হোক, তোমাদের হৃদয় সমান হোক। তোমাদের মন সমান হোক, এই ভাবে তোমাদের সকলের শক্তি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হোক।




     অর্থাৎ আমরা যেন সর্বদা এক মত ও পথে চলি। পবিত্র বেদ আমাদের কোন সম্প্রদায় এর অনুসারী হতে বলে না। বেদ বলে মনুর্ভবঃ অর্থাৎ মানুষ হও এবং কৃণ্বন্তো বিশ্বমার্য়ম্ অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বকে সভ্য বানাও। তাই আমাদের সর্ব প্রথম পরম পিতা পরমাত্মার বাণী বেদ অনুসরণ করে মানুষ হতে হবে, তবেই আমরা আর্য বিশ্ব বা সভ্য বিশ্ব তৈরি করতে পারব। তাই আমাদের সকলের উচিত প্রাচীন মুনি ঋষিদের পথ অনুসরণ করে পুনরায় বেদের পথে ফিরে আসা এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন নির্বাপণ করা। তবেই আমাদের মানব জীবন সার্থক হবে।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

1 comment:

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages