স্ববিরোধী বিবেকানন্দ ?-পর্ব ৪ - অভিজিত রায়কে জবাব-প্রথার অচলায়তনে বন্দি ? - Viral Tender

Post Top Ad

Responsive Ads Here

স্ববিরোধী বিবেকানন্দ ?-পর্ব ৪ - অভিজিত রায়কে জবাব-প্রথার অচলায়তনে বন্দি ?

Share This
“তিনি প্রথাবিরোধী কেউ ছিলেন না, বরং প্রথার সুচতুর রক্ষক। তিনি সনাতন হিন্দুধর্মের প্রতি এতোই মোহাবিষ্ট ছিলেন যে, সংস্কারের প্রয়োজনে পাছে ধর্মে আঘাত লাগে, তাই ‘সমাজ সংস্কার ধর্মের কাজ নয়’ বলে নিশ্চেষ্ট থাকতে চেয়েছেন।”
এবার আসি সমাজ সংস্কার প্রসঙ্গে। অভিজিতের মতে, স্বামিজী ছিলেন ‘প্রথার অচলায়তনে বন্দি’, এবং প্রমাণস্বরূপ পূর্বোক্ত বিধবা, সতীত্ব বিষয়ক উদ্ধৃতির কথা স্মরণ করাতে চেয়েছেন। এছাড়া, তার অভিমত, স্বামিজী জাতিভেদ প্রথাকে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। এর প্রমাণ হিসাবে পূর্বের ন্যায় প্রসঙ্গ ও প্রেক্ষাপটকে আড়ালে রেখে এক-বাক্যের কিছু উদ্ধৃতি দিয়েছেন যা অর্থবিকৃতি ঘটায়। সেসব বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করব, কিন্তু তার আগে একটি কথা, এখানেও কিছু সূত্রের উল্লেখ রয়েছে যা ভুল। অভিজিৎ ‘বাণী ও রচনা’ না পড়ার ফলে, তার লেখার উৎস বই বা প্রবন্ধে দেওয়া ভুল সূত্রকে নিজের লেখাতেও ছাপিয়েছেন – ৫০ ও ৫১ নং উল্লেখ হিসাবে দেওয়া আছে যথাক্রমে ‘স্বামী বিবেবকানন্দর বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩১’ এবং ‘স্বামী বিবেবকানন্দর বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৭’; ও দু’টি আসলে হবে ৯ম খণ্ড।
এবার অভিজিতের বক্তব্যের দিকে তাকানো যাক:

ক)
তিনি প্রথাবিরোধী কেউ ছিলেন না, বরং প্রথার সুচতুর রক্ষক। এটার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রথার অচলায়তনে বন্দি বিবেকানন্দের নিজস্ব স্বীকারোক্তি থেকেই1 –
‘যতোই বয়োবৃদ্ধি হইতেছে, ততই এই প্রাচীন প্রথাগুলি আমার ভালো বলিয়া মনে হইতেছে’।
জাফনায় বেদান্ত বিষয়ক বক্তৃতাকালীন স্বামিজী কথাটি বলেছিলেন। বক্তৃতা থেকে আরো কিছুটা তুলে দেওয়া হল:
আমাদের ধর্ম কাহাকেও বাদ দিতে চায় না, উহা সকলকেই নিজের কাছে টানিযা লইতে চায়। আমাদের জাতিভেদ ও অন্যান্য নিয়মাবলী আপাততঃ ধর্মের সহিত সংসৃষ্ট বলিয়া বোধ হইলেও বাস্তবিক তাহা নহে। সমগ্র হিন্দু জাতিকে রক্ষা করিবার জন্য এই-সকল নিয়মের আবশ্যক ছিল। যখন এই আত্মরক্ষার প্রয়োজন থাকিবে না, তখন ঐ-গুলি আপনা হইতেই উঠিয়া যাইবে।
যতই বয়োবৃদ্ধি হইতেছে, ততই এই প্রাচীন প্রথাগুলি আমার ভাল বলিয়া বোধ হইতেছে। একসময় আমি ঐ-গুলির অধিকাংশই অনাবশ্যক ও বৃথা মনে করিতাম। কিন্তু যতই আমার বয়স হইতেছে, ততই আমি ঐ-গুলির একটিরও বিরুদ্ধে কিছু বলিতে সঙ্কোচ বোধ করিতেছি। কারণ শত শত শতাব্দীর অভিজ্ঞতার ফলে ঐ-গুলি গঠিত হইয়াছে। গতকালের শিশু – যে আগামীকালই হয়তো মৃত্যুমুখে পতিত হইবে – সে যদি আসিয়া আমাকে আমার অনেক দিনের সংকল্পিত বিষয়গুলি পরিত্যাগ করিতে বলে এবং আমিও যদি সেই শিশুর কথা শুনিয়া তাহার মতানুসারে আমার কার্যপ্রণালীর পরিবর্তন করি, তবে আমিই আহাম্মক হইলাম, অপর কেহ নহে। ভারতের বাহিরে নানাদেশে হইতে আমরা সমাজ-সংস্কার সম্বন্ধে যে-সকল উপদেশ পাইতেছি, তাহারও অধিকাংশ ঐ ধরণের। তাহাদিগকে বলো – তোমরা যখন একটি স্থায়ী সমাজ গঠন করিতে পারিবে, তখন তোমাদের কথা শুনিব। তোমরা দুদিন একটা ভাব ধরিয়া রাখিতে পার না, বিবাদ করিয়া উহা ছাড়িয়া দাও; ক্ষুদ্র পতঙ্গের ন্যায় তোমাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী! বুদ্বুদের ন্যায় তোমাদের উৎপত্তি, বুদ্বুদের ন্যায় লয়! আগে আমাদের মতো স্থায়ী সমাজ গঠন কর; প্রথমে এমন কতকগুলি সামাজিক নিয়ম ও প্রথার প্রবর্তন কর, যেগুলির শক্তি শত শত শতাব্দী ধরিয়া অব্যাহত থাকিবে পারে – তখন তোমাদের সহিত এ বিষয়ে আলোচনা করিবার সময হইবে। কিন্তু যতদিন না তাহা হইতেছে, ততদিন তোমরা চঞ্চল বালকমাত্র।2
খেয়াল করুন, স্বামিজী কিন্তু প্রথমেই শুনিয়ে রাখলেন:
আমাদের জাতিভেদ ও অন্যান্য নিয়মাবলী আপাততঃ ধর্মের সহিত সংসৃষ্ট বলিয়া বোধ হইলেও বাস্তবিক তাহা নহে। সমগ্র হিন্দু জাতিকে রক্ষা করিবার জন্য এই-সকল নিয়মের আবশ্যক ছিল। যখন এই আত্মরক্ষার প্রয়োজন থাকিবে না, তখন ঐগুলি আপনা হইতেই উঠিয়া যাইবে।
কিন্তু একথা বললেন না যে, তৎকালীন জাতিভেদ প্রথা উঠিয়ে দেবার সময় হয়েছে। তবে কী তিনি সত্যিই চেয়েছিলেন জাতিভেদ প্রথা চিরস্থায়ী হোক? না। বরং তিনি মনে-প্রাণে অন্তর্বর্ণ বিবাহকে (inter-caste marriage) সমর্থন করেছেন কিন্তু যেহেতু বিষয়টি সংবেদনশীল, তাই এক্ষেত্রে তাঁর নীতি ছিল ‘to go by the way of least possible resistance’।
এর প্রমাণ আমরা পাই তাঁর ব্যক্তিগত আলোচনায় ও তৎপ্রণীত ‘রামকৃষ্ণ মঠের নিয়মাবলী’তে, যেখানে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাবে অন্তর্বর্ণ বিবাহের সপক্ষে বক্তব্য রেখেই ক্ষান্ত হননি, বরং হিন্দু জাতিকে শক্তিশালী করতে এইরূপ বিবাহকে অপরিহার্য বলে ইঙ্গিত করেছেন।
সুরেন্দ্রনাথ সেনের স্মৃতিচারণা:
২২শে জানুআরি, ১৮৯৮ খৃঃ। ১০ই মাঘ শনিবার। সকালে উঠিয়াই হাতমুখ ধুইয়া বাগবাজার ৫৭নং রামকান্ত বসুর স্ট্রীটস্থ বলরাম বাবুর বাটীতে স্বামীজীর কাছে উপস্থিত হইয়াছি। একঘর লোক।
[…] স্বামীজী। […] সমাজ-সংস্কার আর কি করবে? তোমাদের সমাজ-সংস্কার মানে তো বিধবার বিয়ে আর স্ত্রী-স্বাধীনতা বা ঐ রকম আর কিছু। তোমাদের দুই-এক বর্ণের সংস্কারের কথা বলছ তো? দুই-চার জনের সংস্কার হল, তাতে সমস্ত জাতটার কি এসে যায়? এটা সংস্কার না স্বার্থপরতা? নিজেদের ঘরটা পরিষ্কার হল, আর যারা মরে মরুক।
প্রশ্ন। তা হলে কি কোন সমাজ-সংস্কারের দরকার নেই বলেন?
স্বামীজী। দরকার আছে বইকি। আমি তা বলছি না। তোমাদের মুখে যা সংস্কারের কথা শুনতে পাই, তার মধ্যে অনেকগুলোই অধিকাংশ গরীব সাধারণদের স্পর্শ করবে না। তোমরা যা চাও, তা তাদের আছে। এজন্য তারা ওগুলোকে সংস্কার বলেই মনে করবে না। আমার কথা এই যে, শ্রদ্ধার অভাবই আমাদের মধ্যে সমস্ত evils (অনর্থ) এনেছে ও আরও আনছে। আমার চিকিৎসা হচ্ছে রোগের কারণকে নির্মূল করা – রোগ চাপা দিয়ে রাখা নয়। সংস্কার আর দরকার নেই? যেমন ভারতবর্ষে inter-marriage (অন্ত-র্বিবাহ) টা হওয়া দরকার, তা না হওয়ায় জাতটার শারীরিক দুর্বলতা এসেছে।
[…] ২৪শে জানুআরি, ১৮৯৮। ১২ই মাঘ, সোমবার। গত শনিবার যে-লোকটি প্রশ্ন করিয়াছিলেন তিনি আবার আসিয়াছেন। তিনি intermarriage (অন্তর্বিবাহ) সম্বন্ধে আবার কথা পাড়িলেন। বলিলেন, ‘ভিন্ন জাতির সহিত আমাদের কিরূপে আদান-প্রদান হ’তে পারে?’
স্বামীজী। বিধর্মী জাতিদের ভেতর আদান-প্রদান হবার কথা আমি বলি না। অন্ততঃ আপাততঃ তা সমাজ-বন্ধনকে শিথিল করে নানা উপদ্রবের কারণ হবে, এ কথা নিশ্চিত। জানো তো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন - ‘ধর্মে নষ্টে কুলং কৃৎস্ণং’ ইত্যাদি; সমধর্মীদের মধ্যেই বিবাহ-প্রচলনের কথা আমি বলে থাকি।
প্রশ্ন। তা হলেও তো অনেক গোল। মনে করুন আমার এক মেয়ে আছে, সে এদেশে জন্মেছে ও পালিত হয়েছে। তার বিয়ে দিলুম এক পশ্চিমে লোকের সঙ্গে বা মাদ্রাজীর সঙ্গে। বিয়ের পর মেয়ে জামায়ের কথা বোঝে না, জামাইও মেয়ের কথা বোঝে না। আবার পরস্পরের দৈনিক ব্যবহারাদিরও অনেক তফাত। বর-কনে সম্বন্ধে তো এই গণ্ডগোল; আবার সমাজেও মহা বিশৃঙ্খলা এসে পড়বে।
স্বামীজী। ও-রকম বিয়ে হতে আমাদের দেশে এখনও ঢের দেরী। একেবারে ও-রকম করাও ঠিক নয়। কাজের একটা secret (রহস্য) হচ্ছে - to go by the way of least possible resistance (যতদূর সম্ভব কম বাধার পথে চলা)। সেইজন্য প্রথমে এক বর্ণের মধ্যে বিয়ে চলুক। এই বাঙলা দেশের কায়স্থদের কথা ধর। এখানে কায়স্থদের মধ্যে অনেকে শ্রেণী আছে-উত্তররাঢ়ী, দক্ষিণরাঢ়ী, বঙ্গজ ইত্যাদি। এদের পরস্পরের মধ্যে বিবাহ প্রচলিত নেই। প্রথমে উত্তরাঢ়ী ও দক্ষিণরাঢ়ীতে বিবাহ হোক। যদি তো সম্ভব না হয়, বঙ্গজ ও দক্ষিণরাঢ়ীতে বিবাহ হোক। এইরূপে – যেটা আছে, সেটাকেই গড়তে হবে, ভাঙার নাম সংস্কার নয়।3
জাতিভেদ ও অন্তর্বর্ণ বিবাহের সপক্ষে ‘রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের নিয়মাবলী’র সপ্তম অধ্যায়, ‘ভারতবর্ষের কার্য্যপ্রণালী’-তে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তাঁর বক্তব্য রেখেছেন:

• […] the Hindu society will have to be broadened by giving Samskara to all castes down to the Chandala, and even to the foreign races like the Mlechchhas.

• The ideal of this world is that state when “the whole world will be full of Brahman” again, when there will be no need of the Sudra, Vaisya or the Kshatriya powers; […] Only that kind of division into castes will be cordially accepted which is the best means to the elimination of caste distinctions.

• It is the confinement of marital connections among people of the same lineage among very near blood-relations that has debilitated the national physique. It is also well-known in history that no nation with a weak physique can ever be great. Hence one of our foremost duties is to devise means to make the Hindus physically stronger.

• The stopping of intermarriage among different castes, the cessation of marital contact among the different branches into which each caste came to be divided and, above all, the further narrowing down of the scope of marriage by the system of Kulinism, have polluted the blood and greatly reduced the strength and vitality.

• To remedy this evil, efforts should be made at the outset to set up matrimonial relations among the different subdivisions in each caste.4
মনে রাখবেন, স্বামিজী অন্যত্র যাই বলে থাকুন, নিয়মাবলীতে কিন্তু তাঁর প্রাণের কথাই বলে গেছেন। আরও খেয়াল করবেন, এখানেও সেই ‘at the outset’ কথাটি বলেছেন। অর্থাৎ, আপাতত একই বর্ণের সকল শ্রেণীর মধ্যে বিবাহ চলুক, সময় হলে পর ভিন্ন বর্ণের মধ্যেও বিবাহের প্রচলন হবে।
খ) এরপর অভিজিতের বক্তব্য,
তিনি সনাতন হিন্দুধর্মের প্রতি এতোই মোহাবিষ্ট ছিলেন যে, সংস্কারের প্রয়োজনে পাছে ধর্মে আঘাত লাগে, তাই ‘সমাজ সংস্কার ধর্মের কাজ নয়’ বলে নিশ্চেষ্ট থাকতে চেয়েছেন5। তার ব্রাহ্মণ শিষ্যদের উপদেশ দিয়েছেন, ‘তুই বামুন, অপর জাতের অন্ন নাই খেলি’6।
এসব উদ্ধৃতি হল অর্থ বিকৃতির আরো কিছু নমুনা। আগেই বলেছি, অভিজিতের অজ্ঞতার ফলে ৯ম খণ্ড হয়ে গেছে ৫ম! তাছাড়া, ৫১ নং সূত্রটি ৯ম খণ্ডের ৩৭ নং পৃষ্ঠায় নয়, অনেক পরে – ২৬নং অধ্যায়ে উপলব্ধ (আর গ্রন্থের উত্তর কাণ্ডের ৫ম বল্লীতে)। আর উদ্ধৃতিও দিলেন কিনা শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী প্রণীত ‘স্বামি-শিষ্য-সংবাদ’ থেকে (স্বতন্ত্র গ্রন্থরূপেও পাওয়া যায়; ‘বাণী ও রচনা’-য় অধ্যায়ের ক্রম পরিবর্তিত), যেখানে বরাবরই স্বামিজী শিষ্যের জাত্যাভিমান ও ছুঁতমার্গির গোঁড়ামির বিরুদ্ধে খড়গহস্ত। সে প্রসঙ্গে পরে আসব।
এখানে বলে রাখা ভাল, স্বামিজীকে যদি কাছ থেকে দেখতে চান বা জানতে চান, তাহলে ‘বাণী ও রচনা’র ৯ম খণ্ডটি অবশ্যই পড়ুন। এই খণ্ডের অধিকাংশ জুড়ে আছে তাঁর বন্ধু, শিষ্য ও অনুরাগীদের স্মৃতিচারণা যার মাধ্যমে দেশ, জাতি, ধর্ম, সমাজ, শিল্প, কলা, ভাষা, সঙ্গীত, ইত্যদি বিবিধ বিষয় সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত মতামতের সঙ্গে আমরা পরিচিত হতে পারি – পূর্বের আলোচনায় এবং অন্যত্রও তেমন কিছু উদ্ধৃতিও আমরা দিয়েছি। এছাড়া, মানুষ হিসাবে তিনি কেমন ছিলেন, তারও একটা ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।7
সমাজ সংস্কার সম্পর্কে কেন তিনি ‘নিশ্চেষ্ট’ ছিলেন তা একটু আগেই আমরা দেখেছি, যদিও পুনরাবৃত্তি করলে ক্ষতি নেই:
তোমাদের মুখে যা সংস্কারের কথা শুনতে পাই, তার মধ্যে অনেকগুলোই অধিকাংশ গরীব সাধারণদের স্পর্শ করবে না। তোমরা যা চাও, তা তাদের আছে। এজন্য তারা ওগুলোকে সংস্কার বলেই মনে করবে না। আমার কথা এই যে, শ্রদ্ধার অভাবই আমাদের মধ্যে সমস্ত evils (অনর্থ) এনেছে ও আরও আনছে। আমার চিকিৎসা হচ্ছে রোগের কারণকে নির্মূল করা-রোগ চাপা দিয়ে রাখা নয়।
শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকেও তাই বলছেন:
আমার মতে সমাজ সকল দেশেই আপনা-আপনি গড়ে। অতএব বাল্যবিবাহ তুলে দেওয়া, বিধবাদের পুনরায় বে দেওয়া প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার দরকার নেই। আমাদের কাজ হচ্ছে স্ত্রী পুরুষ-সমাজের সকলকে শিক্ষা দেওয়া। সেই শিক্ষার ফলে তারা নিজেরাই কোনটি ভাল, কোনটি মন্দ সব বুঝতে পারবে এবং নিজেরা মন্দটা করা ছেড়ে দেবে। তখন আর জোর ক’রে সমাজের কোন বিষয় ভাঙতে গড়তে হবে না।8
আর ‘বামুন হয়ে অপর জাতের অন্ন খাওয়া’ কথাটির পরিপ্রেক্ষিতে স্বামী-শিষ্যের কথোপকথন তুলে দিলাম:
শিষ্য। […] মহাশয়, মনে যখন সত্ত্বগুণের অত্যন্ত স্ফূর্তি হয়, তখন মাছ- মাংসে স্পৃহা থাকে কি?
স্বামীজী। না, তা থাকে না। সত্ত্বগুণের যখন খুব বিকাশ হয়, তখন মাছ-মাংসে রুচি থাকে না। কিন্তু সত্ত্বগুণ-প্রকাশের এইসব লক্ষণ জানবি – পরের জন্য সর্বস্ব-পণ, কামিনী-কাঞ্চনে সম্পূর্ণ অনাসক্তি, নিরভিমানতা, অহংবুদ্ধিশূন্যতা। এইসব লক্ষণ যার হয়, তার আর animal-food (আমিষাহার)-এর ইচ্ছা হয় না। আর যেখানে দেখবি, মনে ঐসব গুণের স্ফূর্তি নেই, অথচ অহিংসার দলে নাম লিখিয়েছে – সেখানে জানবি হয় ভণ্ডামি, না হয় লোকদেখানো ধর্ম। তোর যখন ঠিক ঠিক সত্ত্বগুণের অবস্থা হবে তখন আমিষাহার ছেড়ে দিস।
শিষ্য। কিন্তু মহাশয়, ছান্দোগ্য শ্রুতিতে তো আছে ‘আহারশুদ্ধৌ সত্ত্বশুদ্ধি’ – শুদ্ধ বস্তু আহার করিলে সত্ত্বগুণের বৃদ্ধি হয়, ইত্যাদি। অতএব সত্ত্বগুণী হইবার জন্য রজঃ-ও তমোগুণোদ্দীপক পদার্থসকলের ভোজন পূর্বেই ত্যাগ করা কি এখানে শ্রুতির অভিপ্রায় নহে?
স্বামীজী। ঐ শ্রুতির অর্থ করতে গিয়ে শঙ্করাচার্য বলেছেন – ‘আহার’-অর্থে ‘ইন্দ্রিয়-বিষয়’, আর শ্রীরামানুজস্বামী ‘আহার’-অর্থে খাদ্য ধরেছেন। আমার মত হচ্ছে তাঁহাদের ঐ উভয় মতের সামঞ্জস্য করে নিতে হবে। কেবল দিনরাত খাদ্যখাদ্যের বাদবিচার করে জীবনটা কাটাতে হবে, না ইন্দ্রিয়সংযম করতে হবে? ইন্দ্রিয়সংযমটাকেই মুখ্য উদ্দেশ্য বলে ধরতে হবে; আর ঐ ইন্দ্রিয়সংযমের জন্যই ভাল-মন্দ খাদ্যাখাদ্যের অল্প- বিস্তর বিচার করতে হবে। শাস্ত্র বলেন, খাদ্য ত্রিবিধ দোষে দুষ্ট ও পরিত্যাজ্য হয়: (১) জাতিদুষ্ট – যেমন পেঁয়াজ, রশুন ইত্যাদি। (২) নিমিত্তদুষ্ট – যেমন ময়রার দোকানের খাবার, দশগন্ডা মাছি মরে পড়ে রয়েছে, রাস্তার ধুলোই কত উড়ে পড়ছে। (৩) আশ্রয়দুষ্ট – যেমন অসৎ লোকের দ্বারা স্পৃষ্ট অন্নাদি। খাদ্য জাতিদুষ্ট ও নিমিত্তদুষ্ট হয়েছে কি না, তা সকল সময়েই খুব নজর রাখতে হয়। কিন্তু এদেশে ঐদিকে নজর একেবারেই উঠে গেছে। কেবল শেষোক্ত দোষটি – যা যোগী ভিন্ন অন্য কেউ প্রায় বুঝতেই পারে না, তা নিয়েই যত লাঠালাঠি চলছে, ‘ছুঁয়োনা ছুঁয়োনা’ করে ছুঁৎমার্গীর দল দেশটাকে ঝালাপালা করেছে। তাও ভালমন্দ লোকের বিচার নেই; গলায় একগাছা সূতো থাকলেই হল, তার হাতে অন্ন খেতে ছুঁৎমার্গী-দের আর অপত্তি নেই। খাদ্যের আশ্রয়দোষ ধরতে পারা একমাত্র ঠাকুরকেই দেখেছি। এমন অনেক ঘটনা হয়েছে, যেখানে তিনি কোন কোন লোকের ছোঁয়া খেতে পারেননি। বিশেষ অনুসন্ধানের পর জানতে পেরেছি – বাস্তবিকই সে-সকল লোকের ভিতর কোন-না-কোন বিশেষ দোষ ছিল। তোদের যত কিছু ধর্ম এখন দাঁড়িয়েছে গিয়ে ভাতের হাঁড়ির মধ্যে! অপর জাতির ছোঁয়া ভাতটা না খেলেই যেন ভগবান-লাভ হয়ে গেল! শাস্ত্রের মহান্ সত্যসকল ছেড়ে কেবল খোসা নিয়েই মারামারি চলছে।
শিষ্য। মহাশয়, তবে কি আপনি বলিতে চান, সকলের স্পৃষ্ট অন্ন খাওয়াই আমাদের কর্তব্য?
স্বামীজী। তা কেন বলব? আমার কথা হচ্ছে তুই বামুন, অপর জাতের অন্ন নাই খেলি; কিন্তু তুই সব বামুনের অন্ন কেন খাবিনি? তোরা রাঢ়ীশ্রেণী বলে বারেন্দ্র বামুনের অন্ন খেতে আপত্তি হবে কেন? আর বারেন্দ্র বামুনই বা তোদের অন্ন না খাবে কেন? মারাঠী, তেলেঙ্গা ও কনোজী বামুনই বা তোদের অন্ন না খাবে কেন? কলকাতার জাতবিচারটা আরও কিছু মজার। দেখা যায়, অনেক বামুন-কায়েতই হোটেলে ভাত মারছেন; তাঁরাই আবার মুখ পুঁছে এসে সমাজের নেতা হচ্ছেন; তাঁরাই অন্যের জন্য জাতবিচার ও অন্ন-বিচারের আইন করছেন! বলি ঐসব কপটীদের আইনমত কি সমাজকে চলতে হবে? ওদের কথা ফেলে দিয়ে সনাতন ঋষিদের শাসন চালাতে হবে, তবেই দেশের কল্যাণ।9
আমরা দেখতে পাচ্ছি, ছুঁৎমার্গীর দলকে যথেষ্ট এক হাত নিয়ে বলছেন – ‘তোদের যত কিছু ধর্ম এখন দাঁড়িয়েছে গিয়ে ভাতের হাঁড়ির মধ্যে! অপর জাতির ছোঁয়া ভাতটা না খেলেই যেন ভগবান-লাভ হয়ে গেল!’
কিন্তু তা সত্ত্বেও শিষ্যের সংশয় যায় নি; উল্টে তাঁর প্রশ্ন: ‘মহাশয়, তবে কি আপনি বলিতে চান, সকলের স্পৃষ্ট অন্ন খাওয়াই আমাদের কর্তব্য?’
তখন স্বামিজী একটু নরম হয়ে বললেন (কোন ‘উপদেশ’ নয়), ‘তা কেন বলব? আমার কথা হচ্ছে তুই বামুন, অপর জাতের অন্ন নাই খেলি; কিন্তু তুই সব বামুনের অন্ন কেন খাবিনি?’
অর্থাৎ, শিষ্যের আহার সংশ্লিষ্ট সংস্কার অত্যন্ত গভীর দেখে খুব বেশী চাপ দিলেন না, কারণ তিনি রিফর্মের পক্ষে, destruction-এর পক্ষে নয়।
কিন্তু এই আহার সংক্রান্ত এই জাত-বিচার যে কত হাস্যকর ও ভণ্ডামীপূর্ণ তা তিনি শিষ্যের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে ভুললেন না –
দেখা যায়, অনেক বামুন-কায়েতই হোটেলে ভাত মারছেন; তাঁরাই আবার মুখ পুঁছে এসে সমাজের নেতা হচ্ছেন; তাঁরাই অন্যের জন্য জাতবিচার ও অন্ন-বিচারের আইন করছেন!
আসলে এই খাদ্য-অখাদ্য বিচারের একটা প্রিলিউড আছে যা আমাদের জানা দরকার। শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীর এই সংস্কারটা যাতে কেটে যায়, তার জন্য স্বামিজী আরো আগে থেকেই যত্ন নিয়েছেন। তেমন দু’টি ঘটনাও ‘স্বামি-শিষ্য-সংবাদ’-এ শিষ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রথম ঘটনাটি বইটি থেকে তুলে দিলাম –
শিষ্য গোঁড়া হিন্দু; অখাদ্য দূরে থাকুক, কাহারো স্পৃষ্ট দ্রব্য পর্যন্ত খায় না। এজন্য স্বামীজী শিষ্যকে কখনো কখনো ‘ভট‍্‍চায’ বলিয়া ডাকিতেন। প্রাতর্জলযোগ সময়ে বিলাতি বিস্কুটাদি খাইতে খাইতে স্বামীজী সদানন্দ স্বামীকে বলিলেন, “ভট‍্‍চাযকে ধরে নিয়ে আয় তো।” আদেশ শুনিয়া শিষ্য নিকটে উপস্থিত হইলে স্বামীজী ঐ-সকল দ্রব্যের কিঞ্চিৎ তাহাকে প্রসাদস্বরূপে খাইতে দিলেন। শিষ্য দ্বিধা না করিয়া তাহা গ্রহণ করিল দেখিয়া স্বামীজী তাহাকে বলিলেন, “আজ কি খেলি তা জানিস্? এগুলি ডিমের তৈরী!” উত্তরে সে বলিল, “যাহাই থাকুক আমার জানিবার প্রয়োজন নাই। আপনার প্রসাদরূপ অমৃত খাইয়া অমর হইলাম।” শুনিয়া স্বামীজী বলিলেন, “আজ থেকে তোর জাত, বর্ণ, আভিজাত্য, পাপপুণ্যাদি অভিমান জন্মের মতো দূর হোক-আশীর্বাদ করছি।”10
এর কয়েক সপ্তাহ/মাসের (এই ঘটনার ক্ষেত্রে গ্রন্থে শুধু সালের উল্লেখ আছে, মাসের নয়) ব্যবধানে ঘটে দ্বিতীয় ঘটনাটি:
আজ তিন দিন হইল স্বামীজী বাগবাজারে ৺বলরাম বসুর বাড়িতে অবস্থান করিতেছেন। […] আজ সিস্টার নিবেদিতাকে সঙ্গে লইয়া স্বামীজী আলিপুরের পশুশালা দেখিতে যাইবেন। শিষ্য উপস্থিত হইলে তাহাকে ও স্বামী যোগানন্দকে বলিলেন, “তোরা আগে চলে যা - আমি নিবেদিতাকে নিয়ে গাড়ি করে একটু পরেই যাচ্ছি।”
[…] প্রায় সাড়ে চারিটার সময় স্বামীজী নিবেদিতাকে সঙ্গে লইয়া পশুশালায় উপস্থিত হইলেন। বাগানের তদানীন্তন সুপারিন্টেন্ডেন্ট রায় বাহাদুর রামব্রহ্ম সান্যাল পরম সাদরে স্বামীজী ও নিবেদিতাকে অভ্যর্থনা করিয়া ভিতরে লইয়া গেলেন […] স্বামী যোগানন্দও শিষ্যের সঙ্গে তাঁহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন।
[…] নানা জীবজন্তু দেখিতে দেখিতে স্বামীজীও মধ্যে মধ্যে জীবের উত্তরোত্তর পরিণতি-সম্বন্ধে ডারউইনের (Darwin) মতের আলোচনা করিতে লাগিলেন।
[…] সিংহব্যাঘ্রের সাহ্লাদ গর্জন শুনিবার এবং সাগ্রহ ভোজন দেখিবার অল্পক্ষণ পরেই উদ্যানমধ্যস্থ রামব্রহ্মবাবুর বাসাবাড়িতে আমরা সকলে উপস্থিত হইলাম। তথায় চা ও জলপানের উদ্যোগ হইয়াছিল। স্বামীজী অল্পমাত্র চা পান করিলেন। নিবেদিতাও চা পান করিলেন। এক টেবিল বসিয়া সিষ্টার নিবেদিতা-স্পৃষ্ট মিষ্টান্ন ও চা খাইতে সঙ্কুচিত হইতেছে দেখিয়া স্বামীজী শিষ্যকে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিয়া উহা খাওয়াইলেন এবং নিজে জলপান করিয়া তাহার অবশিষ্টাংশ শিষ্যকে পান করিতে দিলেন।
[…] শিষ্য স্বামী যোগানন্দের সহিত ট্রাম করিয়া রাত্রি প্রায় ৮টার সময় বাগবাজারে ফিরিয়া আসিল। স্বামীজী ঐ সময়ের প্রায় পনর মিনিট পূর্বে ফিরিয়া বিশ্রাম করিতেছিলেন। প্রায় অর্ধঘণ্টা বিশ্রামান্তে তিনি বৈঠকখানায় আমাদিগের নিকট উপস্থিত হইলেন। স্বামীজী অদ্য পশুশালা দেখিতে গিয়া রামব্রহ্মবাবুর ক্রমবিকাশবাদের অপূর্ব ব্যাখ্যা করিয়াছেন শুনিয়া উপস্থিত সকলে ঐ প্রসঙ্গ বিশেষরূপে শুনিবার জন্য ইতঃপূর্বেই সমুৎসুক ছিলেন। অতএব স্বামীজী আসিবামাত্র সকলের অভিপ্রায় বুঝিয়া শিষ্য ঐ কথাই পাড়িল।
[…] কিছুক্ষণ পরে স্বামীজী রহস্য করিয়া উপস্থিত সকলকে বলিতে লাগিলেন, “আর এক কথা শুনেছেন, আজ এই ভট্‍চায বামুন নিবেদিতার এঁটো খেয়ে এসেছে। তার ছোঁয়া মিষ্টান্ন না হয় খেলি, তাতে তত আসে যায় না, কিন্তু তার ছোঁয়া জলটা কি ক’রে খেলি?”
শিষ্য। তা আপনিই তো আদেশ করিয়াছিলেন। গুরুর আদেশে আমি সব করিতে পারি। জলটা খাইতে কিন্তু আমি নারাজ ছিলাম; আপনি পান করিয়া দিলেন, কাজেই প্রসাদ বলিয়া খাইতে হইল।
স্বামীজী। তোর জাতের দফা রফা হয়ে গেছে - এখন আর তোকে কেউ ভট‍্‍চায বামুন বলে মানবে না!
শিষ্য। না মানে নাই মানুক। আমি আপনার আদেশে চণ্ডালের ভাতও খাইতে পারি। কথা শুনিয়া স্বামীজী ও উপস্থিত সকলে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন।11
গ) এখানেই অভিজিৎ থেমে থাকেনি, নিজের মতকে সমর্থন করতে মিথ্যাচারেরও আশ্রয় নিয়েছে:
স্বামীজি কেবল জাতিপ্রথাকে সমর্থন করেই ক্ষান্ত হননি, এমনকি নিম্নবর্ণের হিন্দুদের তিনি তাঁদের বর্তমান হীন সামাজিক অবস্থাকে মেনে নিতেও পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন, ইন্দুমতী নাম্নী এক পত্রলেখিকাকে তিনি জানাচ্ছেন, “ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় ‘দেব দেবী’ লিখিবে, বৈশ্য ও শূদ্রেরা ‘দাস’ ও দাসী’”।
অভিজিৎ সুচতুর ভাবে ইন্দুমতীর পদবি উল্লেখ না করে পাঠককে বোঝাতে চাইছেন স্বামিজী ‘নিম্নবর্ণের হিন্দুদের […] তাঁদের বর্তমান হীন সামাজিক অবস্থাকে মেনে নিতেও পরামর্শ দিয়েছেন’।
ঘটনা ঠিক তার বিপরীত। ইন্দুমতী কোন তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু নন, তাঁর পদবী ‘মিত্র’! কিন্তু তিনি পত্রে ‘ইন্দুমতী দাসী’ নামে সই করেছিলেন, তাই ওই পরামর্শ। আবার এই জাতপাতের অসারতার কথাও তিনি ইন্দুমতী মিত্রকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ২৪শে মে, ১৮৯৩, বম্বে (অধুনা মুম্বই) থেকে লেখা স্বামিজীর ওই পত্রের কিছুটা অংশ উৎকলিত হল, আপনি নিজেই বিচার করুন:
তুমি ইন্দুমতী ‘দাসী’ কেন লিখিয়াছ? ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় ‘দেব’ ও ‘দেবী’ লিখিবে, বৈশ্য ও শূদ্রেরা ‘দাস’ ও ‘দাসী’ লিখিবে। অপিচ জাতি ইত্যাদি আধুনিক ব্রাহ্মণ-মহাত্মারা করিয়াছেন। কে কাহার দাস? সকলেই হরির দাস, অতএব আপনাপন গোত্রনাম অর্থাৎ পতির নামের শেষভাগ বলা উচিত, এই প্রাচীন বৈদিক প্রথা, যথা-ইন্দুমতী মিত্র ইত্যাদি। আর কি লিখিব মা, সর্বদা জানিবে যে, আমি নিরন্তর তোমাদের কল্যাণ প্রার্থনা করিতেছি। প্রভুর নিকট প্রার্থনা করি, তুমি শীঘ্রই পুত্রবতী হও।12
ঘ) এইরূপ মিথ্যাশ্রয়ী হয়ে অভিজিতের স্থির সিদ্ধান্ত:
এমনকি বিবেকানন্দ জাতিভেদ প্রথাকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন বলে মনে হয়, কারণ তিনি লিখেছেন, ‘জ্ঞানোন্মেষ হলেও কুমোর কুমোরই থাকবে।’
আর একবার বিবেকানন্দ সাহিত্য সম্পর্কে অভিজিতের অজ্ঞতার প্রকাশ পাওয়া গেল – কথাগুলি তিনি বলেছিলেন শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে, যার উল্লেখ রয়েছে ‘স্বামি-শিষ্য-সংবাদ’ গ্রন্থে।
আসলে তাঁদের আলোচনা হচ্ছিল তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে। শিষ্যকে স্বামিজীর উপদেশ:
তোরা এই mass (জনসাধারণ) এর ভেতর বিদ্যার উন্মেষ যাতে হয়, তাতে লেগে যা। এদের বুঝিয়ে বলগে, ‘তোমরা আমাদের ভাই, শরীরের একাঙ্গ; আমরা তোমাদের ভালবাসি, ঘৃণা করি না।’ তোদের এই sympathy (সহানুভূতি) পেলে এরা শত-গুণ উৎসাহে কার্যতৎপর হবে। আধুনিক বিজ্ঞানসহায়ে এদের জ্ঞানোন্মেষ করে দে। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, সাহিত্য – সঙ্গে সঙ্গে ধর্মের গূঢ়তত্ত্বগুলি এদের শেখা। ঐ শিক্ষার বিনিময়ে শিক্ষকগণেরও দারিদ্র্য ঘুচে যাবে। আদানপ্রদানে উভয়েই উভয়ের বন্ধুস্থানীয় হয়ে দাঁড়াবে।13
তখন শিষ্যের আপত্তি:
কিন্তু মহাশয়, ইহাদের ভিতর শিক্ষার বিস্তার হইলে ইহারাও তো আবার কালে আমাদের মতো উর্বরমস্তিষ্ক অথচ উদ্যমহীন ও অলস হইয়া উহাদিগের অপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর লোকদিগের পরিশ্রমের সারাংশ গ্রহণ করিতে থাকিবে?
এই যুক্তির (!) খণ্ডনে স্বামিজী বললেন:
তা কেন হবে? জ্ঞানোন্মেষ হলেও কুমোর কুমোরই থাকবে, জেলে জেলেই থাকবে, চাষা চাষই করবে। জাত-ব্যবসা ছাড়বে কেন? ‘সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেৎ’-এই ভাবে শিক্ষা পেলে এরা নিজ নিজ বৃত্ত ছাড়বে কেন? জ্ঞানবলে নিজের সহজাত কর্ম যাতে আরও ভাল করে করতে পারে, সেই চেষ্টা করবে।
এমন বক্তব্যে অভিজিতের উষ্মা প্রকাশ প্রত্যাশিত কারণ আমাদের সমাজের আর পাঁচজন শিক্ষিত ব্যক্তির মতই সেও কায়িক শ্রমকে হীন দৃষ্টিতে দেখে থাকে। স্বামিজীর দৃষ্টিতে কিন্তু কোন কাজই হীন নয়, এবং আমরাও যাতে এমন কাজকে খাটো চোখে না দেখি তেমন উপদেশও তিনি দিয়েছেন। নরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় লিখেছেন: আমাকে একবার স্বাবলম্বন শিক্ষা দিয়েছিলেন। বললেন, “কারুর সেবা নিবি না! নিজে সব কাজ করবি। কোন কাজই ছোট নয়, মনে নিশ্চিত জানবি।”14
উপদেশ তো সবাই দিতে পারে, স্বামিজীর কিন্তু কথায় ও কাজে কোন পার্থক্য ছিল না। আর এক নরেশচন্দ্রের স্মৃতিচারণা: তিন-চারদিন মঠের তিনটি পায়খানার ময়লা সাফ হয়নি। মেথর আসেনি। তাঁর নাকে দুর্গন্ধ গেছে। সটান ময়লার বালতি নিজে বয়ে টালীখোলার দিকে ফেলে দিয়ে এলেন। ছেলেদের শরীর খারাপ হবে, এই ভাবনায় অস্থির। তাঁকে ঐ কাজ করতে দেখে যাঁরা এগিয়ে এলেন, তাঁদের সবাইকে ভীষণ দাবড়ি দিলেন। বললেন, “এখন কেন? এতক্ষণ করতে পারনি?” একটি বালক [খুব সম্ভবত নরেশচন্দ্র স্বয়ং] বালতি করে জল ঢালতে লাগল। তিনি ঝাঁটা দিয়ে অতি সহজভাবেই সব পরিষ্কার করতে লাগলেন। কোন দ্বিধা নেই, সঙ্কোচ নেই।15
ওই ঘটনার উল্লেখ পাই স্বামী অখণ্ডানন্দর স্মৃতিচারণায়। সেখানে তিনি যোগ করেছেন আরও একটি ঘটনার, প্রকাশ করেছেন স্বামিজীর চারিত্রিক সামঞ্জস্যতার:
Hand, Head and Heart (হাত, মস্তিষ্ক ও হৃদয়) - তিনটিরই চর্চা করতে হবে - স্বামীজীর ভিতর তিনটিই ফুটেছিল, আমাদের চেষ্টা করতে হবে প্রথমটি থেকে। স্বামীজীর মতো spiritual (আধ্যাত্মিক) আমরা না হতে পারি - তাঁর মতো heart and intellect (হৃদয় ও বুদ্ধি) না থাকতে পারে, কিন্তু হাতের কাজটার দিক দিয়ে তো আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। মঠে তিনি এতবড় হাণ্ডা মেজেছিলেন, এক ইঞ্চি পুরু ময়লা! আমরা কি একটি বাটিও পরিষ্কার করতে পারি না?
তিনি মঠের পায়খানা পরিষ্কার করেছেন! একদিন গিয়ে দেখেন খুব দুর্গন্ধ - বুঝতে আর বাকি রইল না - গামছাটা একটু মুখে বেঁধে দুহাতে বালতি নিয়ে যাচ্ছেন, তখন সব দেখতে পেয়ে বলে, “স্বামীজী আপনি!” স্বামীজী, হাসি হাসি মুখ, বলছেন, “এতক্ষণে স্বামীজী আপনি!!”16

• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ২২↩

• স্বামী বিবেবকানন্দর বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, জাফনায় বক্তৃতা – বেদান্ত↩

• ঐ, ৯ম খণ্ড, তিনদিনের স্মৃতিলিপি↩

• Rules and Regulations of the Ramakrishna Math Belur, 1898, Plan of Work for India↩

• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩১↩

• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৭↩

• এমনই আর একটি সংকলন ‘স্মৃতির আলোয় স্বামীজী’↩

• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, নবম খণ্ড, স্বামি-শিষ্য-সংবাদ, অধ্যায় ৫↩

• স্বামি-শিষ্য-সংবাদ, উত্তর কাণ্ড, পঞ্চম বল্লী↩

• ঐ, পূর্ব কাণ্ড, অষ্টাদশ বল্লী↩

• ঐ, পূর্ব কাণ্ড, একবিংশ বল্লী↩

• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ষষ্ঠ খণ্ড, পত্রাবলী, পত্র নং ৬৬↩

• ঐ, নবম খণ্ড, স্বামি-শিষ্য-সংবাদ, অধ্যায় ১৮↩

• স্মৃতির আলোয় স্বামীজী, চতুর্থ অধ্যায়, নরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়↩

• ঐ, চতুর্থ অধ্যায়, নরেশচন্দ্র ঘোষ↩

• ঐ, প্রথম অধ্যায়, স্বামী অখণ্ডানন্দ↩

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages