তার জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তিনি সন্ন্যাস জীবনের মাহাত্ম্যে অনুপ্রাণিত হয়ে সন্ন্যাসী হননি, তিনি হয়েছিলেন অভাবের তাড়নায়। […] সেজন্যই তার সন্ন্যাস জীবনের লেবাস ভেদ করে মাঝেমধ্যেই উঁকি দিতো উদগ্র লোভাতুর গৃহী রূপটিও।
প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখেছি অভিজিৎ নিঃসংশয় যে বিবেকানন্দ ব্রহ্মচর্য ব্রতের উল্লঙ্ঘনকারী।
ঘটনা পরম্পরা যাচাই না করেই, শুধুমাত্র নিজের ধারণার বশবর্তী হয়েই তিনি নির্দ্বিধায় জগতের কাছে ঘোষণা করছেন অজিত সংহের পুত্রের জনক বিবেকানন্দ স্বয়ং। সন্ন্যাসের অন্যতম ব্রত কৃচ্ছসাধনের প্রতি স্বামিজীর নিষ্ঠা নিয়েও এই মুক্তমনা প্রশ্ন তুলেছেন, ও তাঁকে বিলাসী বলে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন। স্বামিজীর সেই বিলাসিতার অঙ্গ ছিল একটি সোনার চেন সহ ঘড়ি। তাকে কেন্দ্র করে একটা ঘটনা:
সেদিন সন্ধ্যার কিছু পূর্বে দশ বার জন যুবক এসে স্বামীজীকে দর্শন করবার অভিপ্রায়ে উপরের বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন। স্বামীজী ঘর থেকে বাইরে এলে তাঁরা তাঁকে প্রায় ঘিরে ফেললেন, স্বামীজীও সহজভাবে সকলের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কখনো কারও কাঁধে হাত দিয়ে, কখনো কারও পিঠে চাপড় মেরে এমনভাবে প্রসন্ন ও প্রফুল্ল মনে কথাবার্তা বলছিলেন, যেন তিনি তাদেরই একজন। তাঁর গলায় ছিল একটি সোনার ঘড়ির চেন। সেকালে সোনার ঘড়ি ও ঘড়ির চেন ব্যবহার করার প্রথা ছিল, কিন্তু স্বামীজীকে কখনো এই ঘড়ি ও চেন ব্যবহার করতে দেখিনি। তাঁর সুন্দর রঙে এই সোনার চেনটি দিব্যি মানিয়েছিল। একটি যুবক ঐ চেনে হাত দিয়ে বললেন, “এ চেনটি তো ভারি সুন্দর!” স্বামীজী তাঁর দিকে একবার চেয়ে দেখলেন; পরক্ষণে ঘড়ি ও চেনটি খুলে ফেলে বললেন, “নে, এটা তোকে দিলুম। তোর খুব পছন্দ হয়েছে — তা তুই-ই এটা রাখ।” ছেলেটি বিস্ময়ে হতবাক। ঘড়ি ও ঘড়ির চেন নিয়ে তিনি কি করবেন বা কি বলবেন, ভেবে পেলেন না। পরক্ষণে স্বামীজী তাঁকে বললেন,“এটা তোকে দিলুম; কিন্তু দেখিস - বিক্রি করিসনে যেন। নিজের কাছেই রাখিস।”
শুনেছি বিলেতে থাকাকালে কোন বিশিষ্ট মহিলা স্বামীজীকে ঘড়িটি উপহার দিয়েছিলেন। এমন মহামূল্য বস্তুটি স্বচ্ছন্দে এক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে দান করে দিলেন কেন, তা আমরা ভেবে পেলাম না। তবে তাঁর ত্যাগ দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হলো, সন্দেহ নেই। একবার তিনি বলেছিলেন, “প্রাপ্ত বস্তুর ত্যাগই ত্যাগ। যার সব আছে - অথচ উদাসীন, তারই ঠিক ত্যাগ। যে নিজেই ভিখিরি - তার আবার ত্যাগ?”1
স্বামিজীর এই ‘বিলাসিতা’-কে বুঝতে শেষ কথাটাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা, অর্থাৎ বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত সমাজ মূলত চাকুরিজীবি। এই এক প্রজন্ম আগেও, সার্ভিস সেক্টরের বৃদ্ধির পূর্বে, যখন তথ্যপ্রযুক্তি (Info-tech) বা অন্যান্য ক্ষেত্রে বহুজাতিক সংস্থাগুলির রমরমা শুরু হয়নি, অর্থপ্রাচুর্য কাকে বলে তা আমরা জানতাম না, ‘বিলাসিতা করব!’ – এমন চিন্তার বিলাসিতাও আমাদের ছিল না; আমাদের অবস্থা ছিল স্বামিজী কথিত ‘ভিখিরি’-র থেকে সামান্য উন্নত অবস্থা মাত্র (আঠারো শতকের ‘আলালের ঘরের দুলাল’-দের কথা এখানে হচ্ছে না)। বাংলাদেশের হলেও, পরবর্তী কালে মার্কিন নাগরিকতা প্রাপ্ত অভিজিৎ সেই সমাজের নব প্রজন্মের একজন, স্বাভাবিক ভাবেই ‘বিলাসিতা’ ও ‘শৌখিনতা’-র মধ্যে পার্থক্য করতে এখনো শেখেনি। এই দু’টির পার্থক্য প্রধানত মানসিকতায় – বিলাসিতা হল ভোগের উপকরণে গা ভাসিয়ে দেওয়া, ইংলিশে যাকে বলে indulgence; শৌখিনতার মধ্যে আছে রুচিশীলতা, সৌন্দর্যবোধের পরিচয়, বিলাসিতার ইন্দ্রিয়পরায়ণতা ও আসক্তি এখানে অনুপস্থিত। তাই স্বামিজী অবলীলায় সোনার চেন ও ঘড়ি এক অজ্ঞাত যুবককে দিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু আমরা পারি না।
***
প্রথম অধ্যায়ে বলেছিলাম, স্বামিজীর ‘পেট বৈরাগ্য’ নিয়ে পরে আলোচনা করব। এখন সেই প্রসঙ্গে আসি। তিনি ভোজন বিলাসী ছিলেন একথা সর্বজনবিদিত, এবং এ বিষয়ে তাঁর সমকালেই তাঁকে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এমনই একটা ঘটনার কথা স্বামী তুরীয়ানন্দর স্মৃতিচারণা থেকে:
স্বামীজী তামাক খান, মাছ খান, এজন্যই আমাদের মধ্যেই একজন কেউ স্বামীজীকে একবার বলেছিল, “দেখ, তোমার অভ্যাসগুলি শোধরানো দরকার। নতুবা তোমার জন্য আমাকে অনেক লোকের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।” সে মনে করেছিল স্বামীজী এই কথায় হয়তো খুব খুশি হয়ে যাবেন আর তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাবেন। কিন্তু তিনি অতিশয় শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “তুই তোর কাজ কর। আমাকে defend করবার কোন আবশ্যক নেই তোর।”2
সত্যিই তো, তিনিই যখন বলে গেছেন, তখন তাঁর ভোজন রসিকতা নিয়ে তাঁকে defend করার আমরা কে? তাই বলে, ‘জিহ্বা লাম্পট্য’ কি একটু অতিরিক্ত কর্কশ শোনায় না? তার সত্যতাই বা কতটুকু? একটু দেখাই যাক –
এই সময়ের [পরিব্রাজক কালের] মীরাটের স্মৃতি আমাদের মনে খুব জাগরূক রহিয়াছে। […] স্বামীজী হৃষীকেশের অসুখের পর মীরাটে পরিবর্তন করিয়াই আবার পূর্ব স্বাস্থ্য লাভ করিয়াছিলেন। […] এই সময়ের একদিনের ঘটনা চিরদিনের মতো হৃদয়ে অঙ্কিত আছে। […] একদিন পোলাও কালিয়া প্রভৃতি রান্না করিয়াছেন। আর মাংসের কিমা করাইয়াছেন, তাঁহার কিছু শিক-কাবাক করিবার ইচ্ছা। হরিভাইকে শিক-কাবাব খাওয়াব। কিন্তু শিক পাওয়া গেল না, কিন্তু স্বামীজী কি দমিবার পাত্র; সম্মুখে কিছু লিচুগাছ ছিল। তারই গোটাকতক ছোট ডাল ছিঁড়ে নিয়ে তাতেই কিমা জড়িয়ে দিয়ে কাবাব তৈরি হলো। সে যে কি উপাদেয় হলো, তা আর কি বলব। আমরা ভাল হয়েছে বলায় সব আমাদের খাইয়ে দিলেন। নিজে দাঁতে কাটলেন না। আমরা বলায় বললেন যে, আমি ওসব ঢেড় খেয়েছি। তোমাদের খাইয়ে আমার বড় সুখ হচ্ছে, সব খেয়ে ফেল। বোঝ। ঘটনা সামান্য কিন্তু চিরতরে হৃদয়ে গাঁথা হয়ে আছে। […] কত যে যত্ন, কত যে ভালবাসা, কত গল্প, কত বেড়ানো, সব স্মৃতিপটে জ্বল জ্বল করছে।3
• স্মৃতির আলোয় স্বামীজী, দ্বিতীয় অধ্যায়, মন্মথনাথ গঙ্গোপাধ্যায়↩
• ঐ, প্রথম অধ্যায়, স্বামী তুরীয়ানন্দ↩
• ১৯/১২/১৯১৫ তারিখে স্বামী প্রেমানন্দকে লেখা এক পত্রে স্বামী তুরীয়ানন্দ, স্বামী প্রভানন্দ প্রণীত ‘ব্রহ্মানন্দচরিত’ গ্রন্থের ‘দিব্য উত্তরাধিকার’ শীর্ষক অধ্যায়ে উদ্ধৃত।↩
গ্রন্থপঞ্জি
• ১. স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (http://www.baniorachana.nltr.org/khandabali.php)
• ২. স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (http://www.ebanglalibrary.com/vivekananda/)
• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৯ম খণ্ড, (উদ্বোধন কার্যালয়, ১৯৮৯, ১৯৮৯ ও ১৯৮৩)
• ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্য, ব্রহ্মানন্দ-লীলাকথা, (ক্যালকাটা বুক হাউস, ১৩৯৫ বঙ্গাব্দ)
• মহেন্দ্রনাথ দত্ত, লণ্ডনে বিবেকানন্দ, ১ম খণ্ড (দি মহেন্দ্র পাবলিশিং কমিটি, ২০০৭)
• মহেন্দ্রনাথ দত্ত, শ্রীমৎ বিবেকানন্দ স্বামীজীর জীবনের ঘটনাবলি, ২য় খণ্ড (দি মহেন্দ্র পাবলিশিং কমিটি, ১৪০৭ বঙ্গাব্দ)
• সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, বিবেকানন্দ চরিত, (আনন্দ পাবলিশার্স, ১৪০১ বঙ্গাব্দ)
• স্বামী অব্জজানন্দ (সম্পাদক), স্বামিজীর পদপ্রান্তে (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৩)
• স্বামী ঈশানানন্দ, মাতৃসান্নিধ্যে (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১১)
• স্বামী তেজসানন্দ, স্মৃতি-সঞ্চয়ন (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০০৭)
• স্বামী প্রভানন্দ, ব্রহ্মানন্দচরিত (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০০৬)
• স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ (সম্পাদক), স্মৃতির আলোয় স্বামীজী (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৩)
• স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ, স্বামী বিবেকানন্দ এবং ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রাম (উদ্বোধন কার্যালয়, ১৯৮৮)
• সুধীর চক্রবর্তী, গভীর নির্জন পথে (আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১২)
• শ্রীঅরবিন্দ, উত্তরপাড়া অভিভাষণ, অনুবাদক: শ্রীঅনিলবরণ (সর্ব্ব সেবক সঙ্ঘ, ১৯৯৪)
• শঙ্করীপ্রসাদ বসু, বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ, ৩য় খণ্ড (মণ্ডল বুক হাউস, ২০০৩)
• শরৎ রচনাবলী, পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত রচনা (http://www.ebanglalibrary.com/sharatchandra/)
• শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী, স্বামি-শিষ্য-সংবাদ (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১২)
• The Complete Works of Swami Vivekananda (Wikipedia edition)
• Ajit Singh of Khetri (Wiki article ~ https://en.wikipedia.org/wiki/Ajit_Singh_of_Khetri)
• Lizelle Reymond, The Dedicated (Aruna Prakashan, 2014)
• Rajiv Malhotra, Being Different: An Indian Challenge to Western Universalism (Harper Collins, 2013)
• Ram Swarup, The Word As Revelation: Names of Gods (Impex India, September 1980)
• Ram Swarup, Ramakrishna Mission: In Search of a New Identity (Voice of India, 1986)
• S N Balagangadhara, The Heathen in His blindness: Asia, the West and the Dynamic of Religion (Web source)
• Sister Nivedita, The Master As I Saw Him (Udbodhan Office, 1996)
• Sita Ram Goel, How I Became A Hindu (Voice of India, 1987)
• Sri Aurobindo, Early Cultural Writings (http://www.sriaurobindoashram.org/ashram/sriauro/writings.php)
• Sri Aurobindo, SABCL Vol. 4, Writings in Bengali (http://incarnateword.in/sabcl/04/a-letter-to-barin)
• Sri Aurobindo, Karmayogin (http://www.collectedworksofsriaurobindo.com/index.php/01-works-of-sri-aurobindo/03-cwsa/08-karmayogin)
• Swami Nitya-Swarup-Ananda, Back to Vivekananda (Swami Nitya-Swarup-Ananda, 1991)
• Yuval Noah Harari, Sapiens: A Brief History of Humankind (Vintage Books, 2014)
প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখেছি অভিজিৎ নিঃসংশয় যে বিবেকানন্দ ব্রহ্মচর্য ব্রতের উল্লঙ্ঘনকারী।
ঘটনা পরম্পরা যাচাই না করেই, শুধুমাত্র নিজের ধারণার বশবর্তী হয়েই তিনি নির্দ্বিধায় জগতের কাছে ঘোষণা করছেন অজিত সংহের পুত্রের জনক বিবেকানন্দ স্বয়ং। সন্ন্যাসের অন্যতম ব্রত কৃচ্ছসাধনের প্রতি স্বামিজীর নিষ্ঠা নিয়েও এই মুক্তমনা প্রশ্ন তুলেছেন, ও তাঁকে বিলাসী বলে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন। স্বামিজীর সেই বিলাসিতার অঙ্গ ছিল একটি সোনার চেন সহ ঘড়ি। তাকে কেন্দ্র করে একটা ঘটনা:
সেদিন সন্ধ্যার কিছু পূর্বে দশ বার জন যুবক এসে স্বামীজীকে দর্শন করবার অভিপ্রায়ে উপরের বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন। স্বামীজী ঘর থেকে বাইরে এলে তাঁরা তাঁকে প্রায় ঘিরে ফেললেন, স্বামীজীও সহজভাবে সকলের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কখনো কারও কাঁধে হাত দিয়ে, কখনো কারও পিঠে চাপড় মেরে এমনভাবে প্রসন্ন ও প্রফুল্ল মনে কথাবার্তা বলছিলেন, যেন তিনি তাদেরই একজন। তাঁর গলায় ছিল একটি সোনার ঘড়ির চেন। সেকালে সোনার ঘড়ি ও ঘড়ির চেন ব্যবহার করার প্রথা ছিল, কিন্তু স্বামীজীকে কখনো এই ঘড়ি ও চেন ব্যবহার করতে দেখিনি। তাঁর সুন্দর রঙে এই সোনার চেনটি দিব্যি মানিয়েছিল। একটি যুবক ঐ চেনে হাত দিয়ে বললেন, “এ চেনটি তো ভারি সুন্দর!” স্বামীজী তাঁর দিকে একবার চেয়ে দেখলেন; পরক্ষণে ঘড়ি ও চেনটি খুলে ফেলে বললেন, “নে, এটা তোকে দিলুম। তোর খুব পছন্দ হয়েছে — তা তুই-ই এটা রাখ।” ছেলেটি বিস্ময়ে হতবাক। ঘড়ি ও ঘড়ির চেন নিয়ে তিনি কি করবেন বা কি বলবেন, ভেবে পেলেন না। পরক্ষণে স্বামীজী তাঁকে বললেন,“এটা তোকে দিলুম; কিন্তু দেখিস - বিক্রি করিসনে যেন। নিজের কাছেই রাখিস।”
শুনেছি বিলেতে থাকাকালে কোন বিশিষ্ট মহিলা স্বামীজীকে ঘড়িটি উপহার দিয়েছিলেন। এমন মহামূল্য বস্তুটি স্বচ্ছন্দে এক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে দান করে দিলেন কেন, তা আমরা ভেবে পেলাম না। তবে তাঁর ত্যাগ দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হলো, সন্দেহ নেই। একবার তিনি বলেছিলেন, “প্রাপ্ত বস্তুর ত্যাগই ত্যাগ। যার সব আছে - অথচ উদাসীন, তারই ঠিক ত্যাগ। যে নিজেই ভিখিরি - তার আবার ত্যাগ?”1
স্বামিজীর এই ‘বিলাসিতা’-কে বুঝতে শেষ কথাটাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা, অর্থাৎ বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত সমাজ মূলত চাকুরিজীবি। এই এক প্রজন্ম আগেও, সার্ভিস সেক্টরের বৃদ্ধির পূর্বে, যখন তথ্যপ্রযুক্তি (Info-tech) বা অন্যান্য ক্ষেত্রে বহুজাতিক সংস্থাগুলির রমরমা শুরু হয়নি, অর্থপ্রাচুর্য কাকে বলে তা আমরা জানতাম না, ‘বিলাসিতা করব!’ – এমন চিন্তার বিলাসিতাও আমাদের ছিল না; আমাদের অবস্থা ছিল স্বামিজী কথিত ‘ভিখিরি’-র থেকে সামান্য উন্নত অবস্থা মাত্র (আঠারো শতকের ‘আলালের ঘরের দুলাল’-দের কথা এখানে হচ্ছে না)। বাংলাদেশের হলেও, পরবর্তী কালে মার্কিন নাগরিকতা প্রাপ্ত অভিজিৎ সেই সমাজের নব প্রজন্মের একজন, স্বাভাবিক ভাবেই ‘বিলাসিতা’ ও ‘শৌখিনতা’-র মধ্যে পার্থক্য করতে এখনো শেখেনি। এই দু’টির পার্থক্য প্রধানত মানসিকতায় – বিলাসিতা হল ভোগের উপকরণে গা ভাসিয়ে দেওয়া, ইংলিশে যাকে বলে indulgence; শৌখিনতার মধ্যে আছে রুচিশীলতা, সৌন্দর্যবোধের পরিচয়, বিলাসিতার ইন্দ্রিয়পরায়ণতা ও আসক্তি এখানে অনুপস্থিত। তাই স্বামিজী অবলীলায় সোনার চেন ও ঘড়ি এক অজ্ঞাত যুবককে দিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু আমরা পারি না।
***
প্রথম অধ্যায়ে বলেছিলাম, স্বামিজীর ‘পেট বৈরাগ্য’ নিয়ে পরে আলোচনা করব। এখন সেই প্রসঙ্গে আসি। তিনি ভোজন বিলাসী ছিলেন একথা সর্বজনবিদিত, এবং এ বিষয়ে তাঁর সমকালেই তাঁকে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এমনই একটা ঘটনার কথা স্বামী তুরীয়ানন্দর স্মৃতিচারণা থেকে:
স্বামীজী তামাক খান, মাছ খান, এজন্যই আমাদের মধ্যেই একজন কেউ স্বামীজীকে একবার বলেছিল, “দেখ, তোমার অভ্যাসগুলি শোধরানো দরকার। নতুবা তোমার জন্য আমাকে অনেক লোকের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।” সে মনে করেছিল স্বামীজী এই কথায় হয়তো খুব খুশি হয়ে যাবেন আর তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাবেন। কিন্তু তিনি অতিশয় শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “তুই তোর কাজ কর। আমাকে defend করবার কোন আবশ্যক নেই তোর।”2
সত্যিই তো, তিনিই যখন বলে গেছেন, তখন তাঁর ভোজন রসিকতা নিয়ে তাঁকে defend করার আমরা কে? তাই বলে, ‘জিহ্বা লাম্পট্য’ কি একটু অতিরিক্ত কর্কশ শোনায় না? তার সত্যতাই বা কতটুকু? একটু দেখাই যাক –
এই সময়ের [পরিব্রাজক কালের] মীরাটের স্মৃতি আমাদের মনে খুব জাগরূক রহিয়াছে। […] স্বামীজী হৃষীকেশের অসুখের পর মীরাটে পরিবর্তন করিয়াই আবার পূর্ব স্বাস্থ্য লাভ করিয়াছিলেন। […] এই সময়ের একদিনের ঘটনা চিরদিনের মতো হৃদয়ে অঙ্কিত আছে। […] একদিন পোলাও কালিয়া প্রভৃতি রান্না করিয়াছেন। আর মাংসের কিমা করাইয়াছেন, তাঁহার কিছু শিক-কাবাক করিবার ইচ্ছা। হরিভাইকে শিক-কাবাব খাওয়াব। কিন্তু শিক পাওয়া গেল না, কিন্তু স্বামীজী কি দমিবার পাত্র; সম্মুখে কিছু লিচুগাছ ছিল। তারই গোটাকতক ছোট ডাল ছিঁড়ে নিয়ে তাতেই কিমা জড়িয়ে দিয়ে কাবাব তৈরি হলো। সে যে কি উপাদেয় হলো, তা আর কি বলব। আমরা ভাল হয়েছে বলায় সব আমাদের খাইয়ে দিলেন। নিজে দাঁতে কাটলেন না। আমরা বলায় বললেন যে, আমি ওসব ঢেড় খেয়েছি। তোমাদের খাইয়ে আমার বড় সুখ হচ্ছে, সব খেয়ে ফেল। বোঝ। ঘটনা সামান্য কিন্তু চিরতরে হৃদয়ে গাঁথা হয়ে আছে। […] কত যে যত্ন, কত যে ভালবাসা, কত গল্প, কত বেড়ানো, সব স্মৃতিপটে জ্বল জ্বল করছে।3
• স্মৃতির আলোয় স্বামীজী, দ্বিতীয় অধ্যায়, মন্মথনাথ গঙ্গোপাধ্যায়↩
• ঐ, প্রথম অধ্যায়, স্বামী তুরীয়ানন্দ↩
• ১৯/১২/১৯১৫ তারিখে স্বামী প্রেমানন্দকে লেখা এক পত্রে স্বামী তুরীয়ানন্দ, স্বামী প্রভানন্দ প্রণীত ‘ব্রহ্মানন্দচরিত’ গ্রন্থের ‘দিব্য উত্তরাধিকার’ শীর্ষক অধ্যায়ে উদ্ধৃত।↩
গ্রন্থপঞ্জি
• ১. স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (http://www.baniorachana.nltr.org/khandabali.php)
• ২. স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (http://www.ebanglalibrary.com/vivekananda/)
• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৯ম খণ্ড, (উদ্বোধন কার্যালয়, ১৯৮৯, ১৯৮৯ ও ১৯৮৩)
• ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্য, ব্রহ্মানন্দ-লীলাকথা, (ক্যালকাটা বুক হাউস, ১৩৯৫ বঙ্গাব্দ)
• মহেন্দ্রনাথ দত্ত, লণ্ডনে বিবেকানন্দ, ১ম খণ্ড (দি মহেন্দ্র পাবলিশিং কমিটি, ২০০৭)
• মহেন্দ্রনাথ দত্ত, শ্রীমৎ বিবেকানন্দ স্বামীজীর জীবনের ঘটনাবলি, ২য় খণ্ড (দি মহেন্দ্র পাবলিশিং কমিটি, ১৪০৭ বঙ্গাব্দ)
• সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, বিবেকানন্দ চরিত, (আনন্দ পাবলিশার্স, ১৪০১ বঙ্গাব্দ)
• স্বামী অব্জজানন্দ (সম্পাদক), স্বামিজীর পদপ্রান্তে (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৩)
• স্বামী ঈশানানন্দ, মাতৃসান্নিধ্যে (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১১)
• স্বামী তেজসানন্দ, স্মৃতি-সঞ্চয়ন (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০০৭)
• স্বামী প্রভানন্দ, ব্রহ্মানন্দচরিত (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০০৬)
• স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ (সম্পাদক), স্মৃতির আলোয় স্বামীজী (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৩)
• স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ, স্বামী বিবেকানন্দ এবং ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রাম (উদ্বোধন কার্যালয়, ১৯৮৮)
• সুধীর চক্রবর্তী, গভীর নির্জন পথে (আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১২)
• শ্রীঅরবিন্দ, উত্তরপাড়া অভিভাষণ, অনুবাদক: শ্রীঅনিলবরণ (সর্ব্ব সেবক সঙ্ঘ, ১৯৯৪)
• শঙ্করীপ্রসাদ বসু, বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ, ৩য় খণ্ড (মণ্ডল বুক হাউস, ২০০৩)
• শরৎ রচনাবলী, পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত রচনা (http://www.ebanglalibrary.com/sharatchandra/)
• শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী, স্বামি-শিষ্য-সংবাদ (উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১২)
• The Complete Works of Swami Vivekananda (Wikipedia edition)
• Ajit Singh of Khetri (Wiki article ~ https://en.wikipedia.org/wiki/Ajit_Singh_of_Khetri)
• Lizelle Reymond, The Dedicated (Aruna Prakashan, 2014)
• Rajiv Malhotra, Being Different: An Indian Challenge to Western Universalism (Harper Collins, 2013)
• Ram Swarup, The Word As Revelation: Names of Gods (Impex India, September 1980)
• Ram Swarup, Ramakrishna Mission: In Search of a New Identity (Voice of India, 1986)
• S N Balagangadhara, The Heathen in His blindness: Asia, the West and the Dynamic of Religion (Web source)
• Sister Nivedita, The Master As I Saw Him (Udbodhan Office, 1996)
• Sita Ram Goel, How I Became A Hindu (Voice of India, 1987)
• Sri Aurobindo, Early Cultural Writings (http://www.sriaurobindoashram.org/ashram/sriauro/writings.php)
• Sri Aurobindo, SABCL Vol. 4, Writings in Bengali (http://incarnateword.in/sabcl/04/a-letter-to-barin)
• Sri Aurobindo, Karmayogin (http://www.collectedworksofsriaurobindo.com/index.php/01-works-of-sri-aurobindo/03-cwsa/08-karmayogin)
• Swami Nitya-Swarup-Ananda, Back to Vivekananda (Swami Nitya-Swarup-Ananda, 1991)
• Yuval Noah Harari, Sapiens: A Brief History of Humankind (Vintage Books, 2014)

No comments:
Post a Comment