“লাগাতার প্রচারণার মাধ্যমে বিবেকানন্দকে খুব ঘটা করে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদী’ ব্যক্তিত্বে পরিণত করা হয়েছে, তাকে দেয়া হয়েছে ‘দেশ নায়ক’ উপাধি। অথচ বিবেকানন্দের স্বাজাত্যবোধের উৎস কখনোই ভারতীয়তা ছিলো না, ছিল হিন্দুত্ব। […]্বামীজি ভারতবর্ষ বলতে কেবল হিন্দুদের ভারতবর্ষই বুঝতেন।”
স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দুত্বের পূজারী না সেকুলার, গত শতাধিক বছর ধরে এই নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়ে এসেছে, আজও তা বিরামহীন। প্রথম পক্ষে আছে সঙ্ঘ পরিবার ও অন্যান্য হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা, অপর পক্ষে কিন্তু বাম-সেকুলারবাদীরা নয়, আছে প্রধানত রামকৃষ্ণ মিশন ও তার অনুগামীরা। ভূমিকাতেই বলেছি তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রধান উদ্দেশ্য হিন্দু জাতির পুনরুত্থান। কিভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম তা ব্যাখ্যা করেছি এই অধ্যায়ের প্রথমাংশে। দ্বিতীয়াংশে আমাদের আলোচ্য ভারতীয়ত্বের চরিত্র নিরূপন, এবং হিন্দুত্ব ও ভারতীয়ত্ব কতটা অসম্পৃক্ত তা নির্ণয় করা।
প্রথম প্রসঙ্গ শুরু করব পূর্ব অধ্যায়ে আলোচিত মেরী হেলকে লেখা স্বামিজীর পত্র দিয়ে। তবে এবার চিঠিটির অন্যান্য অংশের দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে।
British rule in modern India has only one redeeming feature, though unconscious; it has brought India out once more on the stage of the world; it has forced upon it the contact of the outside world. If it had been done with an eye to the good of the people concerned, as circumstances favoured Japan with, the results could have been more wonderful for India. No good can be done when the main idea is blood-sucking. On the whole the old regime was better for the people, as it did not take away everything they had, and there was some justice, some liberty.
A few hundred, modernised, half-educated, and denationalised men are all the show of modern English India — nothing else.
[…] In spite of the centuries of anarchy that reigned during the struggles of the English to conquer, the terrible massacre the English perpetrated in 1857 and 1858, and the still more terrible famines that have become the inevitable consequence of British rule (there never is a famine in a native state) and that take off millions, there has been a good increase of population, but not yet what it was when the country was entirely independent — that is, before the Mohammedan rule.
[…] There has been a reign of terror in India for some years. English soldiers are killing our men and outraging our women — only to be sent home with passage and pension at our expense. We are in a terrible gloom — where is the Lord? Mary, you can afford to be optimistic, can I? Suppose you simply publish this letter — the law just passed in India will allow the English Government in India to drag me from here to India and kill me without trial. And I know all your Christian governments will only rejoice, because we are heathens. Shall I also go to sleep and become optimistic? Nero was the greatest optimistic person! They don’t think it worth while to write these terrible things as news items even! […] Heathen-murdering is only a legitimate pastime for the Christians!1
স্বামিজীর মতে বৃটিশদের দ্বারা রেল, টেলিগ্রাফ ও নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলনের মূল উদ্দেশ্য রক্তশোষণ, সে কথা আগেই বলেছি। এছাড়াও স্বামিজীর উপরোক্ত বক্তব্যের আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক আছে। তার অন্যতম, তিনি মুসলমান শাসকদের বিদেশি হিসাবেই দেখতেন, মুঘল শাসনও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আরো স্পষ্ট আকার পায় তাঁর ‘স্বদেশমন্ত্রে’, যেখানে স্বদেশবাসীর কাছে তাঁর আহ্বান:
হে বীর, সাহস অবলম্বন করো, সদর্পে বলো – আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই; বল – মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই। তুমিও কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হইয়া সদর্পে ডাকিয়া বলো -ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ; ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী। 2
এর সাথে তুলনা করুন নজরুলের সেই বিখ্যাত গানের দু’টি পংক্তি:
“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!3
স্বামিজী কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের ভ্রাতৃত্বের কথা বললেন না, বললেন ব্রাহ্মণ-চণ্ডালের ভ্রাতৃত্বের কথা; রাম-রহিমের উল্লেখ তিনি করলেন না, করলেন ভারতের দেবদেবীর। আবার –
I know all your Christian governments will only rejoice, because we are heathens. […] Heathen-murdering is only a legitimate pastime for the Christians!
এই কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন, পাশচাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মূলত খ্রিস্টীয় সভ্যতার ধারক ও বাহক, এবং এই শক্তি হিন্দু সভ্যতাকে ধ্বংস করতে উন্মুখ।
স্বামিজী তাঁর সুগভীর ঐতিহাসিক চেতনাবলে উপলব্ধি করেছিলেন, মধ্যযুগের হিন্দু-মুসলমান সংঘাত বা ইংরেজ সহ অন্যান্য পাশ্চাত্য শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম কোন রাজ-রাজাদের সংঘাত নয়, এটা সভ্যতার সংঘাত (Clash of Civilizations), যা এখনো থেমে যায়নি।
তাঁর সেই ভাবনারও ইঙ্গিত মেলে পূর্বোল্লিখিত Rules and Regulations-এ যেখানে ভবিষ্যৎ ভারতের অন্যতম বিপদ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন ইসলাম এবং খ্রিস্টীয় মতবাদের আধিপত্যকে, যা হলে কিনা –
[The] Indian civilization and the Aryan race will be destroyed very soon. For whoever goes out of the Hindu religion, is not only lost to us, but also we have in him one more enemy.
স্বামিজী অনুভব করেছিলেন ভারতের সংগ্রাম শুধু বৃটিশ অধীনতা থেকে মুক্ত হবার জন্য নয়, এই সংগ্রাম মাতৃভূমির হিন্দু সত্ত্বাকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তাই স্বাধীনতার আশু প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করলেও (এ প্রসঙ্গে পূর্ব অধ্যায়ে আলোচনা করেছি), ইংরেজ তাড়ানোর আপাত লক্ষ্য তাঁর মনকে আচ্ছন্ন করেনি, যেমনটা আমরা প্রত্যক্ষ করি পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে। এখানেই তাঁর বিশেষত্ব; বিবেকানন্দ ছিলেন কালদ্রষ্টা।
কিন্তু উপরোক্ত দৃষ্টান্তসমূহ পরোক্ষ প্রমাণ। কোথাও কি স্বামিজী ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে উল্লেখ করেছেন? অবশ্যই। খেতড়ির রাজার অভিনন্দনের উত্তরে তিনি যে পত্র লিখেছিলেন, চতুর্থ অধ্যায়ে তার কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছিলাম। সেই পত্রেই তিনি স্বদেশকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে অভিহিত করেছেন:
Nowadays everybody blames those who constantly look back to their past. It is said that so much looking back to the past is the cause of all India’s woes. To me, on the contrary, it seems that the opposite is true. So long as they forgot the past, the Hindu nation remained in a state of stupor; and as soon as they have begun to look into their past, there is on every side a fresh manifestation of life. It is out of this past that the future has to be moulded; this past will become the future.
The more, therefore, the Hindus study the past, the more glorious will be their future, and whoever tries to bring the past to the door of everyone, is a great benefactor to his nation.4
স্বামিজীর ভারত যে হিন্দু ভারত, তাঁর জাতীয়তাবাদ যে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, তার অকাট্য প্রমাণ বিবেকানন্দ সাহিত্যের আনাচে-কানাচে, সর্বত্র খুঁজে পাওয়া যায়। তাই যারা স্বামিজীকে সেকুলার সাজাতে চেয়েছেন তারা অভিজিতের মত একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, অর্থাৎ –
• ক) প্রেক্ষাপটহীন উদ্ধৃতি
• খ) আংশিক বক্তব্যের প্রকাশ
• গ) বিকৃত ব্যাখ্যা
• ঘ) শব্দার্থের বিকৃতি
• ঙ) সেন্সরশিপ
প্রথম তিনটির উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হল এই পক্ষের মানুষদের অতি প্রিয় ‘ইসলামিক দেহ এবং বৈদান্তিক মস্তিষ্ক’, ভূমিকায় যার উপর আলোকপাত করেছি। বস্তুত, বহুল প্রচারিত স্বামিজীর তথাকথিত সেকুলারবাদী উক্তি প্রায় সবই পশ্চিমী ও মুসলমান শ্রোতা বা পাঠকদের উদ্দেশ্যে (৩২ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য), ফলে প্রেক্ষাপটবিহীন এইসব উক্তি হিন্দুদেরকে বিভ্রান্ত করে।
বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে বাংলা সাহিত্যে যথেচ্ছ বিকৃতি ঘটানো হয় তাঁর ব্যবহৃত ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সমন্বয়’ শব্দ দু’টিকে।
যেমন, ‘ভারতের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক মাদ্রাজে প্রদত্ত অন্তিম বক্তৃতা থেকে অভিজিতীয় স্টাইলে কয়েকটি উদ্ধৃতি দিয়ে সহজেই দেখানো যায়, স্বামিজী সেকুলারবাদের সমর্থক: * ১) ‘ভারত-গঠনে ধর্মের ঐক্যসাধন অনিবার্যরূপে প্রয়োজন।’ - ২) ‘ভারতীয় বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়-সাধনাই ভবিষ্যৎ ভারত-গঠনের প্রথম কর্মসূচি ..’ - ৩) ‘আমরা যে মন্দির প্রতিষ্ঠা করিবার কথা বলিতেছি, উহা অসাম্প্রদায়িক হইবে ..’
কিন্তু তাঁর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন: ক) কেবল আমাদের জাতির পবিত্র ঐতিহ্য—আমাদের ধর্মই আমাদের সম্মিলনভূমি, ঐ ভিত্তিতেই আমাদিগকে জাতীয় জীবন গঠন করিতে হইবে। ইওরোপে রাজনীতিই জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। এশিয়ায় কিন্তু ধর্মই ঐ ঐক্যের মূল। অতএব ভাবী ভারত-গঠনে ধর্মের ঐক্যসাধন অনিবার্যরূপে প্রয়োজন। এই ভারতভূমির পূর্ব হইতে পশ্চিম, উত্তর হইতে দক্ষিণ – সর্বত্র সকলকে এক ধর্ম স্বীকার করিতে হইবে। এক ধর্ম—এ কথা আমি কি অর্থে ব্যবহার করিতেছি? খ্রীষ্টান, মুসলমান বা বৌদ্ধগণের ভিতর যে-হিসাবে এক ধর্ম বিদ্যমান, আমি সে-হিসাবে ‘এক ধর্ম’ কথাটি ব্যবহার করিতেছি না। আমরা জানি, আমাদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্তসমূহ যতই বিভিন্ন হউক, উহাদের যতই বিভিন্ন দাবী থাকুক, তথাপি কতকগুলি সিদ্ধান্ত এমন আছে – যেগুলি সম্বন্ধে সকল সম্প্রদায়ই একমত। অতএব আমাদের সম্প্রদায়সমূহের এইরূপ কতকগুলি সাধারণ সিদ্ধান্ত আছে, আর ঐগুলি স্বীকার করিবার পর আমাদের ধর্ম সকল সম্প্রদায় ও সকল ব্যক্তিকে বিভিন্ন ভাব পোষণ করিবার, ইচ্ছামত চিন্তা ও কাজ করিবার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়া থাকে।
খ) ধর্ম যে সর্বোচ্চ আদর্শ – ইহা তো সত্যই, কিন্তু আমি এখানে সে-কথা বলিতেছি না; আমি বলিতেছি, ভারতের পক্ষে কাজ করিবার ইহাই একমাত্র উপায়—প্রথমে ধর্মের দিকটা দৃঢ় না করিয়া এখানে অন্য কোন বিষয়ের জন্য চেষ্টা করিতে গেলে সর্বনাশ হইবে। সুতরাং ভারতীয় বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়-সাধনাই ভবিষ্যৎ ভারত-গঠনের প্রথম কর্মসূচি, যুগযুগান্তর ধরিয়া অবস্থিত কালজয়ী ঐ মহাচল হইতেই এই প্রথম সোপান প্রস্তুত করিতে হইবে। আমাদিগকে জানিতে হইবে যে—দ্বৈতবাদী, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী, অদ্বৈতবাদী, শৈব, বৈষ্ণব, পাশুপত প্রভৃতি সকল সম্প্রদায়ের হিন্দুর মধ্যেই কতকগুলি সাধারণ ভাব আছে; আর নিজেদের কল্যাণের জন্য, জাতির কল্যাণের জন্য আমাদের পরস্পর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় লইয়া বিবাদ ও পরস্পর ভেদবুদ্ধি পরিত্যাগ করিবার সময় আসিয়াছে। নিশ্চয় জানিও, এই-সকল বিবাদ সম্পূর্ণ ভ্রমাত্মক, আমাদের শাস্ত্র ইহার তীব্র নিন্দা করিয়া থাকেন, আমাদের পূর্বপুরুষগণ ইহা অননুমোদন করেন না, আর যাঁহাদের বংশধর বলিয়া আমরা দাবী করিয়া থাকি, যাঁহাদের রক্ত আমাদের শিরায় শিরায় প্রবহমান, সেই মহাপুরুষগণ অতি তুচ্ছ বিষয় লইয়া তাঁহাদের সন্তানগণের এইরূপ বিবাদ অতি ঘৃণার চক্ষে দেখিয়া থাকেন।
গ) কিভাবে আমাদের কাজ করিতে হইবে? দৃষ্টান্তস্বরূপ এই মান্দ্রাজের কথাই ধর। আমাদিগকে একটি মন্দির নির্মাণ করিতে হইবে – কারণ হিন্দুগণ সকল কাজেরই প্রথমে ধর্মকে লইয়া থাকে। তোমরা বলিতে পার, ঐ মন্দিরে কোন্ দেবতার পূজা হইবে – এই বিষয় লইয়া বিভিন্ন সম্প্রদায় বিবাদ করিতে পারে। এরূপ হইবার কিছুমাত্র আশঙ্কা নাই। আমরা যে মন্দির প্রতিষ্ঠা করিবার কথা বলিতেছি, উহা অসাম্প্রদায়িক হইবে, উহাতে সকল সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ উপাস্য ওঙ্কারেরই কেবল উপাসনা হইবে। যদি কোন সম্প্রদায়ের ওঙ্কারোপাসনায় আপত্তি থাকে, তবে তাহার নিজেকে ‘হিন্দু’ বলিবার কোন অধিকার নাই। যে-কোন সম্প্রদায়ভুক্ত হউক না কেন, প্রত্যেকেই নিজ নিজ সম্প্রদায়গত ভাব অনুসারে ঐ ওঙ্কারের ব্যাখ্যা করিতে পারে, কিন্তু সর্বসাধারণের উপযোগী একটি মন্দিরের প্রয়োজন। অন্যান্য স্থানে তোমাদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পৃথক্ পৃথক্ দেবপ্রতিমা থাকিতে পারে, কিন্তু এখানে ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিগণের সহিত বিরোধ করিও না। 5
সমগ্র বক্তৃতা জুড়ে তাঁর একটাই প্রচেষ্টা – বিভিন্ন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন। মাদ্রাজ হোক বা লাহোর 6, ভারতে প্রত্যাবর্তনের পর বিভিন্ন সভায়, বক্তৃতায় তাঁর বক্তব্যের অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল হিন্দু ধর্মের synthesis, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে ঐকমত্যের প্রতিষ্ঠা, হিন্দু-মুসলমান-খ্রিশ্চান ধর্মের সমন্বয় নয়।
আংশিক বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে মঠ ও শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্ম-সমন্বয় প্রসঙ্গে স্বামিজীর বাণীকে বিকৃত করা কিছু কঠিন নয়:
ঈশ্বর করেন তো এ মঠকে মহাসমন্বয়ক্ষেত্র করে তুলতে হবে। ঠাকুর আমাদের সর্বভাবের সাক্ষাৎ সমন্বয়মূর্তি। ঐ সমন্বয়ের ভাবটি এখানে জাগিয়ে রাখলে ঠাকুর জগতে প্রতিষ্ঠিত থাকবেন।
অথচ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন স্থাপনের উদ্দেশ্যও কিন্তু অদ্বৈতবাদের ভিত্তিতে হিন্দু সমাজের এক মহাসমন্বয় ক্ষেত্র গড়ে তোলা:
ঈশ্বর করেন তো এ মঠকে মহাসমন্বয়ক্ষেত্র করে তুলতে হবে। ঠাকুর আমাদের সর্বভাবের সাক্ষাৎ সমন্বয়মূর্তি। ঐ সমন্বয়ের ভাবটি এখানে জাগিয়ে রাখলে ঠাকুর জগতে প্রতিষ্ঠিত থাকবেন। সর্বমতের সর্বপথের আচণ্ডাল ব্রাহ্মণ—সকলে যাতে এখানে এসে আপন আপন ideal (আদর্শ) দেখতে পায়, তা করতে হবে। সেদিন যখন মঠের জমিতে ঠাকুরকে স্থাপন করলুম তখন মনে হল, যেন এখান হতে তার ভাবের বিকাশ হয়ে চরাচর বিশ্ব ছেয়ে ফেলছে! আমি তো যথাসাধ্য করছি ও করব – তোরাও ঠাকুরের উদার ভাব লোকদের বুঝিয়ে দে। বেদান্ত কেবল পড়ে কি হবে? Practical life (কর্মজীবন)-এ শুদ্ধদ্বৈতবাদের সত্যতা প্রমাণিত করতে হবে। শঙ্কর এ অদ্বৈতবাদকে জঙ্গলে পাহাড়ে রেখে গেছেন; আমি এবার সেটাকে সেখান থেকে সংসারে ও সমাজের সর্বত্র রেখে যাব বলে এসেছি। ঘরে ঘরে, মাঠে ঘাটে, পর্বতে প্রান্তরে এই অদ্বৈতবাদের দুন্দুভিনাদ তুলতে হবে। তোরা আমার সহায় হয়ে লেগে যা। 7
কোথায় হিন্দু-মুসলমান ভ্রাতৃত্ব, স্বদেশ মন্ত্রের মতো এখানেও তো সেই আচণ্ডাল-ব্রাহ্মণের ঐক্যের কথা! বস্তুত, হিন্দুদের কাছে তাঁর উচ্চারিত ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র অর্থ non-sectarianism, secularism বা non-communalism নয়। কিন্তু মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে নিরঙ্কুশ ভাবে এই অর্থ বিকৃতি হয়ে চলেছে।
পঞ্চম, অর্থাৎ সেন্সরশিপের উদাহরণ, মঠের নিয়মাবলীর অন্তর্গত ‘ভারতবর্ষের কার্য্যপ্রণালী’-কে জনসমক্ষে না আনা।8 নিয়মাবলী মঠের আভ্যন্তরীণ বিষয়, তাই তা প্রকাশ না করার যুক্তি আছে, কিন্তু ‘ভারতবর্ষের কার্য্যপ্রণালী’ (‘Plan of Work for India’) তো কর্মকাণ্ডের দিক-নির্দেশ, এটা প্রকাশ করতে সমস্যা কোথায়? সমস্যা একটাই, এই নির্দেশিকা প্রকাশ পেলে সেকুলারী প্রচারের বেলুনটা যে ফেটে যায়!
এই সেকুলারী প্রোপাগান্ডা কোন ট্র্যাজি-কমিকাল পর্যায়ে গেছে তার দৃষ্টান্ত ২০১৪ সালের ৭ই মার্চ, ‘দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদন –
‘শ্রীকৃষ্ণ, মুহম্মদের মত শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মহাপুরুষ ছিলেন না বিবেকানন্দ’
বিবি গোস্বামী
শিলচর, ৬ মার্চ: এ যেন গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজো। স্বামী বিবেকানন্দের ‘সম্প্রদায়-বিহীন বিশ্বজনীন ধর্মের’ উদাত্ত আহ্বানের দর্শনে স্নাত হয়ে তাঁর জন্ম সার্ধশতবর্ষ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলো শিলচরের রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম। স্বামী বিবেকানন্দ যে ‘যাবতীয় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে, তিনি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর সন্ন্যাসী নন’ সে কথা রামকৃষ্ণ মিশনের পদস্থ কর্মকর্তারা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিলেন।
বৃহস্পতিবার শিলচর রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রমে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ১৭৯তম শুভ জন্ম তিথি এবং স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম সার্ধশতবর্ষ উদযাপনের সমাপ্তি উৎসবের ছিল চতুর্থ দিন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দিতে গিয়ে কলকাতা বাগবাজারের রামকৃষ্ণ মঠের অধ্যক্ষ স্বামী বিশ্বনাথানন্দজি মহারাজ বলেন, বৃটিশরা যখন বাংলা তথা ভারতের শাসন ক্ষমতায় আরোহণ করে তখন বঙ্গদেশে চলছিল সামাজিক ক্ষেত্রে অন্ধকারময় যুগ। এই সুযোগে শ্রীরামপুরের মিশনারিরা বাংলায় বাইবেল ছাপিয়ে বিনা পয়সায় তা বণ্টন করতে শুরু করে। সমগ্র বাংলাদেশকে তারা খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার প্রয়াস চালায়। যিশু খ্রিস্টের মহানুভবতার প্রতি কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্য ধর্ম-বিশ্বাসের প্রতি উপহাস করত তারা। শুধু এখানেই শেষ নয়, সীমিত ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে ব্রিটিশরা বাঙালিদের শুধুই কেরানি তৈরির চেষ্টা চালায়।
স্বামী বিশ্বনাথানন্দজি বলেন, ‘ঠিক এই সময়েই রামকৃষ্ণদেব সপ্তর্ষিমণ্ডল থেকে বিবেকানন্দ নামে এক ঋষিকে ধরে নিয়ে এসেছিলেন। সেই অন্ধকার যুগে বিবেকানন্দের অতি প্রয়োজন বোধ করেছিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। রামকৃষ্ণদেব বিবেকানন্দকে যে ব্রত দিয়েছিলেন তা সফল হবেই’, বলেন বিশ্বনাথানন্দজি মহারাজ। তিনি বলেন, রামকৃষ্ণদেব বিবেকানন্দকে যে ব্রত দিয়েছিলেন তা হল ক্ষুধার্তকে অন্নদান। তিনি মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখেছিলেন। স্বামীজি এসেছিলেন জগৎকে শিক্ষা দিতে। মহারাজ বলেন, সে সময় দেশে প্রাচীন ভারতীয় ঋষিমুনিদের শিক্ষা অস্তাচলে। স্বামী বিবেকানন্দ তাই মূল্যবোধের শিক্ষার জোর দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন স্ত্রী-শিক্ষা। স্বামীজি চেয়েছিলেন মানবধর্ম। বিবেকানন্দ ধর্মের মানবিক মুখটি উন্মোচন করেছিলেন, উল্লেখ করেন স্বামী বিশ্বনাথানন্দজি। রামকৃষ্ণ মঠের অধ্যক্ষ বলেন, রামকৃষ্ণদেবের শিক্ষা সারাজীবন ধরে বাস্তবায়ন করে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন স্বামীজি। তিনি জীবে প্রেম-এর মাধ্যমে মানুষকে মানুষ হবার মন্ত্র দিয়ে গেছেন, বলেন তিনি। বিশেষ অতিথি কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশন, স্বামী বিবেকানন্দের পৈতৃক ভিটে ও সংস্কৃতিক কেন্দ্রের সম্পাদক স্বামী পূর্ণাত্মানন্দজি মহারাজ তাঁর ভাষণে বলেন, স্বামী বিবেকানন্দ কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের সন্ন্যাসী ছিলেন না। পশ্চিমীরা তাঁকে হিন্দু সন্ন্যাসী হিসেবে চালিয়ে দিলেও স্বামীজি ছিলেন সম্প্রদায়মুক্ত এক বিশ্বজনীন ধর্মের প্রবক্তা। তিনি তাঁর শিকাগো ভাষণেও বারবার এই দর্শনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পূর্ণাত্মানন্দজি মহারাজ বলেন, ‘রাম, শ্রীকৃষ্ণ, যিশুখ্রিস্ট, মহম্মদ, বুদ্ধদেব, চৈতন্য - এঁরা সবাই ছিলেন এক একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মহাপুরুষ। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দকে এভাবে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মহাপুরুষ বলা যাবে না। তিনি ছিলেন বিশ্বজনীন ধর্মের প্রবক্তা। পূর্ণাত্মানন্দজি মহারাজ মনে করেন, রামকৃষ্ণদেবের যত মত তত পথ-এর শিক্ষা থেকেই বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন যে ঈশ্বর এক, তিনি আলাদা করে কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নন। ‘বিবেকানন্দ বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িক ধর্মের দিন শেষ হয়ে আসছে। পৃথিবী যত উদার হচ্ছে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের বিদায় নেওয়ার পালা। পৃথিবী নতুন দিনের অপেক্ষায়’, উল্লেখ করেন পূর্ণাত্মানন্দজি মহারাজ।
সভায় এর আগে স্বাগত ভাষণ দেন শিলচর রামকৃষ্ণ মিশনের সম্পাদক স্বামী সত্যস্থানন্দজি। এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন করিমগঞ্জ রামকৃষ্ণ মিশন সেবা সমিতির সম্পাদক স্বামী নরেশানন্দজি মহারাজ, শিলচরের বিবেকবাহিনীর সভাপতি তথা বিশিষ্ট সংস্কৃত পণ্ডিত সুখময় ভট্টাচার্য, কাছাড় কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপিকা রমা পুরকায়স্থ, শিলচর রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম কার্যকরী সমিতির সদস্য পীযূষ ভট্টাচার্য। পৌরোহিত্য করেন কার্যকরী সমিতির সভাপতি অমলেন্দু স্বামী।
এর আগে মিশনের সন্ন্যাসীরা শান্তিমন্ত্র পাঠের মাধ্যমে প্রদীপ প্রজ্বলন করে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন।
স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম সার্ধশতবর্ষ উদযাপনের সপ্তাহব্যাপী এই সমাপ্তি উৎসব শুরু হয়েছে গত সোমবার। চলবে রবিবার পর্যন্ত। রোজই চলছে প্রচুর ভক্তসমাগম। উৎসব উপলক্ষে নানা কর্মসুচিতে সেজে উঠেছে শিলচরের এই ঐতিহ্যবাহী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম।
বিবেকানন্দকে সেকুলার বানানোর চেষ্টা তাহলে কেন, আপনার মনে এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। কারণ, গোড়ায় গলদ। সর্ব-ধর্ম-সমন্বয়কে যদি শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাবের মুখ্য উদ্দেশ্য বলে প্রচার করা হয় (যা শ্রীমা ও স্বামিজী স্বীকার করেননি, ভূমিকা দ্রষ্টব্য) তখন তাঁর প্রধান শিষ্যকে সেকুলার না বানিয়ে উপায় কি? 9
যাই হোক, অভিজিতের দৃষ্টিতে (নাকি নিরঞ্জন ধর, রাজেশ দত্ত বা মোর্তজাদের চোখে?) স্বাভাবিক ভাবেই স্বামিজী হিন্দুত্বের পূজারী, ‘ভারতীয়তা’র নন। কিন্তু ‘ভারতীয়তা’র সংজ্ঞা কি, এবং হিন্দুত্ব ও ভারতীয়ত্বের মধ্যে পার্থক্য কোথায়, অভিজিৎ তা ব্যাখ্যা করেননি। অস্পষ্ট হলেও হিন্দুত্ব সম্পর্কে সবারই কিছু ধারণা আছে। কিন্তু ‘ভারতীয়তা’ বা ভারতীয় জাতিসত্তা বলতে আমরা কি বুঝি? আজ পর্যন্ত ভারতীয়ত্ব তথা বিশ্বের অন্যান্য জাতিসত্তা কি ধর্মকে পরিহার করে গড়ে উঠেছে ও বিবর্তিত হয়েছে? ইতিহাস কিন্তু অন্য সাক্ষ্য দেয় – ধর্মীয় মতই প্রত্যেক জাতিসত্তার মূল অবলম্বন। তার সাথে যুক্ত করুন ভাষা ও race।
যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন জাতি-সংস্কৃতির melting pot বলে অভিহিত করা হয়, তার জাতিসত্তাকে কিন্তু WASP (White, Anglo-Saxon, Protestant) বলেই চিহ্নিত করা হয়। এই ‘melting pot’ যে একটি myth তা আজ অনেকেই স্বীকার করেন, তাই ধীরে ধীরে এই শব্দের পরিবর্তে Tossed Salad-এর প্রচলন শুরু হয়েছে। মার্কিন রাজনীতিতে যদিও বা Colored (শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ বহির্ভূত) বর্ণের মানুষরা আজ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে, ধর্মে কিন্তু ছাড় নেই – পীযূষ জিন্দলকে (Piyush Jindal) হতে হয়েছে ববি জিন্দল (Bobby Jindal), নম্রতা রনধাওয়া (Nimrata Randhawa) হয়েছেন নিকী হ্যালী (Nikki Haley)।
মানবজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি, ধর্ম ও ভাষা ও racial পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে, অর্থাৎ demography-র পরিবর্তনের সাথে সাথে একটি দেশের চরিত্রেরও রূপান্তর ঘটে। আদিযুগে জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটেছিল সভ্যতার (civilization) হাত ধরেই। তাই, ভারত, চীন, মিশর (ঈজীপ্ট), পারস্য (ইরান) বা গ্রীসকে শুধু nation-state বলা ভুল হবে, এরা সবাই civilization-state। পূর্বোক্ত তিন উপাদানের চারিত্রিক পরিবর্তন বা তার স্থায়িত্বের প্রভাব কি, এইসব দেশ তার দৃষ্টান্ত।
ফারাওদের মিশর আজ সরকারী ভাবে ‘আরব প্রজাতন্ত্র’! সোহরাব-রুস্তমরা আজ আর ইরানে নায়ক হিসাবে বন্দিত নন, জরথুস্ত্র বিস্মৃত; গ্রীসে অলিম্পক আর জাতীয় উৎসব নয়, হারকিউলিস-আকাইলিসের বীরত্ব গ্রীক হৃদয়ে স্পন্দন জাগাতে ব্যর্থ। অথচ ভারতে অর্জুন আজও নায়ক, শ্রীকৃষ্ণ-বুদ্ধ আজও পূজ্য, কুম্ভমেলা আজও লক্ষ-লক্ষ পূণ্যার্থীকে আকর্ষণ করে। চীন কমিউনিস্ট শাসিত হলেও তার ধর্মের পরিবর্তন হয়নি, তাই কনফুশিয়াস ত্যাজ্য হননি। বরং সরকারি মদতে পশ্চিমী দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুশিয়াস ইনস্টিট্যুট খোলা হয়েছে।
কোন সভ্যতা বা তার উদ্ভুত জাতিসত্তার সম্পূর্ণ ধ্বংসসাধন কিভাবে হয়, রোমানীয় দার্শনিক এমিল চেরান (Emile M. Cioran) তার একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন:
A civilization is destroyed only when its gods are destroyed.
কিন্তু শুধু মানুষকে সম্বল করে জাতিসত্তা গড়ে ওঠে না। এর মূল উপাদান দু’টিঃ ক) মানবগোষ্ঠী (demography) খ) ভূখণ্ড 10
প্রজন্মান্তরে একটি মানবগোষ্ঠী ও তাদের অধ্যুষিত ভূখণ্ডের এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটে তার ধর্ম, ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে, ছাপ ফেলে তার সমষ্ঠিগত স্মৃতি ও চেতনায়। গড়ে ওঠে এক জাতিসত্তা। পাষাণ বিগ্রহ যেমন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ভক্তের কাছে, ভূকেন্দ্রিক জাতিসত্তা 11 বা nationality তেমনই জীবন্ত হয়ে ওঠে মানুষের চেতনায় [^৭১২]। খ্রিশ্চান বা ইসলাম মতের ধ্বজাধারীরা শুধু ধর্মান্তরণেই তাদের চেষ্টা সীমিত রাখে না, তাদের লক্ষ্য থাকে নব্য সদস্য ও তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মন থেকে অতীতের স্মৃতি মুছে দিতে, যার ফলে ঘটে সহস্র বছরের জাতীয় চেতনার বিলুপ্তি (অর্থাৎ, deracination), তা হয়ে ওঠে অনাত্মীয় (alien) ও অবশেষে এক নব জাতিসত্তার সৃষ্টি হয়। 12
তাই বিবেকানন্দ ঠিকই বলেছেন:
For whoever goes out of the Hindu religion, is not only lost to us, but also we have in him one more enemy. 13
মনে পড়ে, দুই জার্মানী মিলে যাবার পর বাংলার এক তথাকথিত প্রগতিশীল সাহিত্যিক আক্ষেপ করেছিলেন, ওরা যদি পারে, তাহলে দুই বাংলা কেন মিলতে পারে না। ভদ্রলোক যদি জার্মানী ছেড়ে দুই আয়ারল্যাণ্ডের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেন তাহলে তাঁর আক্ষেপের কোন কারণ থাকত না। জার্মানী বিভক্ত হয়েছিল বিদেশী হস্তক্ষেপের ফলে, এবং (আপাত) বিরুদ্ধবাদী দুই রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা কৃত্রিম ভাবে তা টিকিয়ে রাখা হয়েছিলে; জার্মানরা স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে এই দেশভাগকে মেনে নেয়নি। আয়ারল্যাণ্ডের পরিস্থিতি স্বতন্ত্র, বাংলার সাথে বরং বেশ মিল – সেখানে বিভেদের মূলে আছে ধর্ম, এবং যতদিন না দুই আয়ারল্যাণ্ডের মানুষের ধর্মীয় চেতনা ক্ষীণ হয়, অথবা ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট মতের কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন তাদের বৈরী ভাবকে মুছে দেয়, ততদিন দুই দেশের মিলন অসম্ভব।
আপনি যদি স্বামিজীর এই অবস্থানকে ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা ভাবেন তাহলে মারাত্মক ভুল করবেন। গত হাজার বছর ধরে ইসলাম ও খ্রিস্ট মতাবলম্বীদের আগ্রাসনের ফলে আমরা শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবেই ক্ষয়িষ্ণু হইনি, সবচেয়ে ঘুণ ধরেছে আমাদের বৌদ্ধিক উৎকর্ষতায়। ১৯১৯ সালে শ্রীঅরবিন্দ তাঁর অনুজ বারীন ঘোষকে একটি চিঠিতে তাঁর এই উপলব্ধির কথা জানিয়েছিলেন:
It is my belief that the main cause of India’s weakness is not subjection, nor poverty, nor a lack of spirituality or religion, but a diminution of the power of thought, the spread of ignorance in the birthplace of knowledge. Everywhere I see an inability or unwillingness to think […] This may have been alright in the [dark] medieval period, but now this is the sign of a great decline. 14
হিন্দুর এই বৌদ্ধিক অবনতির সবচেয়ে বড় নিদর্শন তাঁর ধর্মীয় ভাবনায়। বিতর্কের মাধ্যমে কোন ধর্ম-দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করা হিন্দু সমাজের এক প্রাচীন ও শ্রদ্ধেয় পরম্পরা। এইরূপ বিতর্কে অংশগ্রহণকারীর বক্তব্য থাকত দু’ভাগে বিভক্ত – পূর্বপক্ষ ও উত্তরপক্ষ। পূর্বপক্ষে উপস্থাপন করা হত বিপক্ষের মত; উত্তরপক্ষে বক্তা যুক্তির মাধ্যমে সেই মতকে খণ্ডন করার চেষ্টা করতেন।15 যাজ্ঞবল্ক্যের সেই বৈদিক যুগ থেকে শঙ্করাচার্য হয়ে স্বামী দয়ানন্দ পর্যন্ত এই ধারা ছিল অব্যাহত, যদিও মধ্যযুগ থেকে এর ধারাবাহিকতা হয়ে আসে অনেক ক্ষীণ। এর কারণ বিবিধ –
ক) ইসলামিক আক্রমণের ফলে উত্তর ভারতের শিক্ষা-সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো সহ সমাজের বৌদ্ধিক (intellectual) এলিট প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়। সেই ইতিহাস আমাদের অজানা থাকলেও, এই ‘শক’ আমরা আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
খ) রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আঘাতে আসে কূপমণ্ডূকতা, জন্ম নেয় নতুন নতুন সামাজিক বিধিনিষেধ, খর্ব হয় নারী স্বাধীনতা16, বৃদ্ধি পায় জাতিবৈষম্য।
গ) কিন্তু সবচেয়ে বড় শিকার হয় হিন্দুর ইন্টেলেক্ট। এই ভ্যাক্যুয়ামকে পরবর্তীকালে পূরণ করে ভক্তি আন্দোলন। হিন্দুর ইতিহাসে এই প্রথম একটি ভাবাআন্দোলন গড়ে উঠল যার মূলধন আবেগ ও সারল্য, যুক্তি-তর্ক দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোন দর্শন নয়।
এই সকল কারণে মধ্যযুগে ইসলাম ও খ্রিস্ট মত রয়ে গিয়েছিল আমাদের পাঠক্রমের বাইরে।
অবশেষে আঠারো শতকে ইউরোপীয় প্রভাবে ঘটে নবজাগরণ। কিন্তু বিজিত জাতির হীনমন্যতা এই দুই সেমিটিক মতকে খুঁটিয়ে বিচার করার পরিবর্তে নিজেদের মতকে তাদের রঙে রাঙ্গানোর চেষ্টা করল। চেষ্টা হল অদ্বৈতবাদকে monotheism-এর সাথে একই সূত্রে গাঁথার। অথচ আব্রাহামিক বা সেমিটিক মতবাদ এবং ভারতের ধর্মীয় পরম্পরার মধ্যে বিস্তর প্রভেদ।17 অবশ্য এই বাংলাতেই স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীঅরবিন্দ, বঙ্কিম, বিপিন পাল এবং হয়ত আরও কয়েক জন এই প্রভেদ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। কিন্তু তাঁরা শুধুমাত্র এই বিষয় নিয়ে কোন পূর্ণাঙ্গ ও সুসংবদ্ধ আলোচনা করেননি। এই বিষয়ে হিন্দু মানসকে সচেতন করেন রাম স্বরূপ (Ram Swarup), তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থের মাধ্যমে, বিশেষ উল্লেখযোগ্য, ‘The Word As Revelation: Names of Gods’ এবং ‘Hindu View of Christianity and Islam’। অন্যত্র তিনি লিখেছেন:
The Semitic religions are not religions in the Eastern sense of the term. Their thrust is towards outward expansion, not towards inward exploration. In fact, in the Eastern sense, they are not spiritualities, but are what Marx calls ideologies, tailored for political expansion and imperialist aggression.
The two systems differ widely in their outlook, perspective and approach. The former speaks in the language of Self or Atma, the latter in the language of external Gods; the former speaks of the Law, the rita, the inner spiritual and moral law of being and action, the latter speak of Commandments of an external being. 18 19
ভারতোদ্ভূত সকল ধর্ম পরম্পরার উদ্দেশ্য মানুষকে সাত্ত্বিকতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, তাই এর নজর অন্তর্মুখী, লক্ষ্য চিত্তশুদ্ধির দিকে। ইহুদিদের Old Testament জাত দুই মতের লক্ষ্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, যেনতেন প্রকারে বিশ্বজয়; বৈশিষ্ট্যে প্রবল ভাবে রাজসিক। এখানে piety-র 20 উদ্দেশ্য চিত্তশুদ্ধি নয়, মতনিষ্ঠা বৃদ্ধি ও regimentation গড়ে তোলা। যেমন, একপক্ষ উপবাস ভঙ্গ করে স্বল্পাহার দ্বারা, অপর দিকে উপবাসের পর হয় সমবেত ভাবে আমিষ ভোজন। চিন্তানায়ক বিবেকানন্দের কাছে এই পার্থক্য স্পষ্ট; অন্ধ তিনি নন, অন্ধ তাঁর উত্তরসূরীরা এবং বর্তমান হিন্দু সমাজ।
‘ভারতীয়তা’ হিন্দু সভ্যতার অবদান; ভারতের যে অঞ্চলে হিন্দু ধর্ম ও জাতির প্রভাব হ্রাস পাবে, সেখান থেকে ভারতীয়ত্ব লোপ পেতে বাধ্য। ১৯৪৭ সালে নয়, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল সেই দিন, যেদিন ওই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছিল। Idea of India-র নামে যে বহুত্ববাদ (pluralism) ও সহিষ্ণুতার (tolerance) কথা বলা হয়, তা একান্তই হিন্দু। যদি বলেন ফকিরি সম্প্রদায়ের সহিষ্ণুতার কথা তাহলে বলব, এর spirit হিন্দু, খোলসটাই শুধু ইসলামিক, এবং সেই কারণে মোল্লাদের দ্বারা সকল যুগেই তাঁরা কোণঠাসা। সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন:
পীরবাদ আর ফকিরি মতের সঙ্গে নৈষ্ঠিক মুসলমানদের সংগ্রাম ও সংঘর্ষ বেশ পুরনো।
১৯৩৫ সালে এনামুল হক তাঁর ‘বঙ্গে সুফী প্রভাব’ বইতে সরাসরি লিখেছেন, ‘উনিশ শতকে চারিদিক হইতে বাউলদিগকে ধ্বংস করিতে আয়োজন চলিতে লাগিল। এই সময় মুসলমানদের মধ্যে দুইজন খ্যাতনামা সংস্কারক দেখা দিলেন। ইঁহাদের নাম মৌলানা কিরামৎ’ অলী (মৃত্যু ১৮৭৩) ও হবাজী শরী’ অতুল্লাহ্-এর বাড়ি ও কর্মক্ষেত্র ছিল পূর্ববঙ্গ (ফরীদপুর)।’
এখানে বাউল বলতে বুঝতে হবে ফকিরদেরও। শুদ্ধতাবাদীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন লালন ফকির ও তাঁর আচরিত মত। মৌলানা রেয়াজুদ্দিনের ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’ সবচেয়ে কড়া বই এ ব্যাপারে। এ ছাড়া মহম্মদ আলীর ‘মিথ্যা পীর’, ফজলে রহিমের ‘পীর মুরিদ’ মহম্মদ সৈয়দের ‘মারফত নামা’ - এ সব বইতে ধরা আছে নানা ঝাঁঝাঁলো বক্রভাব। […] এ লড়াই আজকের নয়। এক দিনেরও নয়।
কেউই যেন না ভাবেন পীর ফকিরবাদের সঙ্গে শরিয়ত-পন্থীদের এই মতাদর্শের সংঘাত কেবল পশ্চিমবাংলাতেই আবদ্ধ। আসলে বাংলাদেশে এই সংঘর্ষ সংঘাত খুব চরম পর্যায়ে। ইসলামি রাষ্ট্র হিসাবে সেখানে শরিয়তি আইনের দাবি অনেক জোরালো এবং মারফতিদের সেখানে আত্মরক্ষার সংগ্রাম অনেক জটিল। ‘আল সাদীদ’ নামে এক পুস্তিকার শেষে লেখক আতিয়ার রহমান ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিখছেনঃ ‘সমাজবাদ-মার্ক্সবাদ-ওয়াশিংটনবাদে বাংলার মুক্তি নেই। বৃহত্তম মুসলিম জাতির দেশ - এই বাংলাদেশে শরীয়তী সমাজবাদ প্রতিষ্ঠাতেই দেশ ও জাতির উন্নতি নিহিত রয়েছে ।’ ম. আ. সোবহান তাঁর ‘জালালী ফয়সালা’ বইয়ে লালনের মাজার ধ্বংস করার আবেদন করেছেন। 21
প্রচলিত ইসলামের প্রান্তের বাইরে থাকা মুসলমানদের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে সংখ্যালঘু অবস্থায় হিন্দুদের কি দশা হবে তা সহজেই অনুমেয়। কাশ্মীরের দিকে তাকান – খণ্ডিত ভারতের একমাত্র মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই রাজ্যের কয়েক লক্ষ্য হিন্দ আজ নিজ দেশে উদ্বাস্তু! নিঃসন্দেহে, একমাত্র হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু জাতি সুরক্ষিত হলেই ভারতীয়ত্ব সুরক্ষিত হবে – ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ।
শ্রীঅরবিন্দের ভাষায়:
I say no longer that nationalism is a creed, a religion, a faith; I say that it is the Sanatan Dharma which for us is nationalism. This Hindu nation was born with the Sanatan Dharma, with it it moves and with it it grows. When the Sanatan Dharma declines, then the nation declines, and if the Sanatan Dharma were capable of perishing, with the Sanatan Dharma it would perish.
The Sanatan Dharma, that is nationalism. 22
(জাতীয়তাবাদ আমাদের ধর্ম এ কথা আর আমি বলব না; বরং বলব আমাদের পক্ষে সনাতন ধর্মই হচ্ছে জাতীয়তা। এই হিন্দুজাতি জন্মেছিল সনাতন ধর্ম নিয়ে, এর সঙ্গেই সে চলে, এর সঙ্গেই সে বিকাশ লাভ করে। যখন সনাতন ধর্মের অবনতি হয় তখনই জাতির অবনতি হয়, আর যদি সনাতন ধর্মের ধ্বংস হওয়া সম্ভব হত তা হলে সনাতন ধর্মের সঙ্গে এই জাতিটাও ধ্বংস হত। সনাতন ধর্ম, এই [আমাদের] জাতীয়তাবাদ।)
তাহলে অভিজিৎ কেন এই সরল সত্যটিকে উপলব্ধি করতে পারলেন না? মেরী হেলকে প্রেরিত সেই চিঠিতেই রয়েছে তার উত্তর:
A few hundred, modernised, half-educated, and denationalised men are all the show of modern English India — nothing else.
ব্রিটিশ প্রবর্তিত ম্যাকলীয় শিক্ষাব্যবস্থা তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যে বিজাতীয়করণ ঘটিয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যে আজও ঘটে চলেছে তাতে কোন সংশয় নেই। Denationalisation-এর অন্যতম প্রতিশব্দ deracination, এই কথাটা যদি মাথায় রাখি তাহলে বুঝতে পারব যে, বাংলাদেশে জন্ম হলেও, অভিজিৎ নিজেও এই [হিন্দু] বিজাতীয়করণের শিকার – ইংরেজ শাসনের ম্যাকলীয় শিক্ষার যে সকল চিন্তাধারাকে তার পূর্বের কয়েক প্রজন্ম আত্মস্থ (internalise) করেছে, তা ওর মধ্যেও পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাবে সংক্রামিত হয়েছে।
• The Complete Works of Swami Vivekananda, Volume 8, Epistles - Fourth Series, CXLV↩
• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ৬ষ্ঠ খণ্ড, বর্তমান ভারত↩
• কাণ্ডারী হুঁশিয়ার↩
• The Complete Works of Swami Vivekananda, Vol. 4, Writings: Prose, Reply to the Address of the Maharaja of Khetri↩
• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, পঞ্চম খণ্ড, ভারতে বিবেকানন্দ↩
• লাহোরে প্রদত্ত Common Bases of Hinduism↩
• স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, নবম খণ্ড, স্বামি-শিষ্য-সংবাদ, অধ্যায় ২১↩
• গোলপার্কের ইন্সটিটিউট অফ কালচারের সংস্থাপক স্বামী নিত্যস্বরূপানন্দ যদি তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ‘Back to Vivekananda’ না প্রকাশ করতেন তাহলে স্বামী বিবেকানন্দ রচিত হিন্দু জাতিগঠনের এই অমূল্য রূপরেখাটি হতে আমরা বঞ্চিত হতাম। শেলী ব্রাউন (Shelly Brown) প্রণীত তাঁর জীবনী দুই খণ্ডে উপলব্ধ – Centred in Truth: The Story of Swami Nitya-Swarup-Ananda (Volumes 1 & 2)।↩
• শ্রীরামকৃষ্ণের ‘যত মত তত পথ’ও অপব্যাখ্যার শিকার। কিন্তু আমাদের আমাদের আলোচ্য স্বামিজী, তাই প্রসঙ্গান্তরে যাব না। আগ্রহী পাঠককে অনুরোধ করব সত্যানন্দ দেবায়তন হতে প্রকাশিত স্বামী মৃগানন্দের ‘যত মত তত পথ: হিন্দু ঐক্যের ভিত্তি’ এবং রাম স্বরূপের ‘Ramakrishna Mission: In Search of a New Identity’ পড়তে । দ্বিতীয়টি অবশ্য আর স্বতন্ত্র প্রবন্ধরূপে উপলব্ধ নয়, ওটি এখন ‘Hinduism and Monotheistic Religions’ শীর্ষক সংকলনের অন্তর্গত।↩
• কোন অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পদ ও সমৃদ্ধি ভূখণ্ড নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আদি সভ্যতা সকল সবই তাই নদী বা বলা ভাল কৃষি ঊর্বর ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আবার ভারতবর্ষের সমৃদ্ধি যবনদের লালায়িত করেছে এ দেশকে আক্রমণ করার জন্য। সেজন্য জাতিসত্তার সৃষ্টিতে অর্থনীতির ভূমিকা থাকলেও তা পরোক্ষ। মার্কসবাদের প্রভাবে অনেকে জাতিগত সংগ্রামের অপেক্ষা শ্রেণী সংগ্রামকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। এই মত ভ্রান্ত কেন, শ্রেণীগত শোষণের উৎপত্তির কারণ বিচার করে রাম স্বরূপ তা দেখিয়ে দিয়েছেন –
Ram Swarup admitted the validity of Marx regarding the role of class conflict in human history. But he raised a more fundamental question which I had not heard or read anyone raising before I met him. How did classes come to be constituted in the first instance? This was his question. I did not know at that time that Marx had an answer to this question. Classes, according to Marx, had arisen in the primitive communist society when means of production got accumulated and some people appropriated them to the disadvantage of the others. The owners of these means became the haves who now started lording it over the have nots. But even if I had known this answer, it would not have satisfied Ram Swarup. His probe went deeper than that of Marx. How did the haves manage to appropriate the means of production?
So I waited for Ram Swarup to provide his own answer to his own question. He explained to me that classes were in fact the outcome of national conflicts in which one group of people conquered and imposed itself on another group and misappropriated the means of production. To his way of thinking, national conflicts had primacy over class conflicts. The secondary conflicts should not be allowed to obscure or obstruct the resolution of primary conflicts. Ergo, our national conflict with Britain had primacy over whatever class conflicts were present in Indian society.
~ Sita Ram Goel, How I Became A Hindu, Ch. 4 ~ Some Interesting Encounters↩
• বাস্তুচ্যুত হওয়া সত্ত্বেও যদি কোন জাতি তার আদিভূখণ্ডের স্মৃতি ধরে রাখে, তার সাংস্কৃতিক জীবনের প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে যদি সেই স্মৃতি জড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই nation-এর অস্তিত্ব রয়ে যায়, যদিও একটি intangible entity হয়ে – ইহুদিদের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছিল। জাতিসত্তা গঠন ও বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ধর্মের অবিসংবাদী প্রাধান্যের দৃষ্টান্ত ইসরায়েল। সকল ইহুদিরা যদি ধর্মান্তরিত হত কোথায় থাকত আজ এই দেশটি?
আবার, সেই বাসভুমিতে ফিরে যাবার সম্ভাবনা না থাকলে, নতুন অঞ্চলের নামকরণে রয়ে যায় সেই স্মৃতি। নতুন অঞ্চলের সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্যতা, জন্ম নেয় নতুন জাতিসত্তার। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মহাদেশের নতুন দেশগুলি তার উদাহরণ।↩
• য়ুভাল নোয়া হারারি লিখেছেন:
[T]dollar, human rights and the United States of America exist in the shared imagination of billions, and no single individual can threaten their existence. [… S]in order to change them we must simultaneously change the consciousness of billions of people, which is not easy. A change of such magnitude can be accomplished only with the help of a complex organization, such as a political party, an ideological movement, or a religious cult.
~ Yuval Noah Harari, Sapiens: A Brief History of Humankind, Ch. 6 ~ Building Pyramids
মানুষের চেতনায় জাতিসত্ত্বার পরিবর্তন করতে অবশ্য একমাত্র কোন ধর্মমতের দ্বারাই সম্ভব। যেমন, পেগান রোম থেকে খ্রিশ্চান রোম। অথবা আমাদের পার্শ্ববর্তী পাকিস্তান। মুহম্মদ ঘোরী বা মাহমুদ গজনীর মতান্ধতার প্রথম শিকার ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের বর্তমান বংশধরগণ আজ ঘোরীর নামাঙ্কিত মিসাইল প্রস্তুত করে গর্ব বোধ করে।↩
• শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা:
আমাদের একজন পাচক ব্রাহ্মণ ছিল। সে মুসলমানীর প্রেমে মজিয়া ধর্মত্যাগ করে। এক বৎসর পরে দেখা। তাহার নাম বদলাইয়াছে, পোশাক বদলাইয়াছে, প্রকৃতি বদলাইয়াছে, ভগবানের দেওয়া যে আকৃতি, সে পর্যন্ত এমনি বদলাইয়া গিয়াছে যে আর চিনিবার জো নাই। এবং এইটিই একমাত্র উদাহরণ নয়। বস্তির সহিত যাঁহারই অল্পবিস্তর ঘনিষ্ঠতা আছে,—এ কাজ যেখানে প্রতিনিয়তই ঘটিতেছে—তাঁহারই অপরিজ্ঞাত নয় যে এমনিই বটে! উগ্রতায় পর্যন্ত ইহারা বোধ হয় কোহাটের মুসলমানকেও লজ্জা দিতে পারে।
~ শরৎ রচনাবলী, পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত রচনা, বর্তমান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা↩
• SABCL Vol. 4, Writings in Bengali, Part X, A Letter to Barin↩
• ‘পূর্বপক্ষ’র ধারণাকে আমাদের সামনে পুনরায় উপস্থাপিত করার কৃতিত্ব রাজীব মালহোত্রর (Rajiv Malhotra)। এর ব্যাখা করে লিখেছেন:
This is the traditional [Indic] approach to rival schools. It is a dialectical approach, taking a thesis by an opponent (‘purva pakshin’) and then providing its rebuttal (‘khandana’) so as to establish the protagonist’s views (‘siddhanta’). The purva paksha tradition required any debater first to argue from the perspective of his opponent in order test the validity of his understanding of the opposing position, and from there to realize his own shortcomings. Only after perfecting his understanding of opposing views would he be qualified to refute them. […] In purva paksha one does not look away from real differences but attempts to clarify them, without anxiety but also without the pretence of sameness.
~ Rajiv Malhotra, Being Different: An Indian Challenge to Western Universalism, Ch. 1 ~ The Audacity of Difference↩
• “Before Islam, women didn’t wear upper garments.” ~ Pavan K Varma, ‘An Interview with Pavan K Varma’, venetiaansell.wordpress.com. ঘোমটার উৎপত্তির কারণ আন্দাজ করতে পারেন?↩
• ‘Monotheism’-এর সঠিক অনুবাদ ‘একদেববাদ’, একেশ্বরবাদ নয়।↩
• Ram Swarup, Ramakrishna Mission: In Search of a New Identity, Ch V ~ Delusive Ideologies and Hate-Religions↩
• হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্ম ইসলাম-খ্রিস্ট মত থেকে এতটাই পৃথক, একপক্ষকে ধর্ম বলে অভিহিত করলে, অপরটির জন্য অন্য কোন পরিভাষার প্রয়োজন:
[I]the Semitic religions are what religions are, other cultures do not have religions. If other cultures have religions, then the Semitic religions are not religious. The inconsistency lies in insisting that both statements are true.
~ S N Balagangadhara, The Heathen in His blindness: Asia, the West and the Dynamic of Religion, Ch. VIII ~ A Human Tragedy Or The Divine Retribution?↩
• ‘piety’র বাংলা কোন প্রতিশব্দ আছে বলে জানা নেই; শ্রদ্ধা, ভক্তি, নিষ্ঠা, ব্রত পালন ইত্যাদি সব কিছুই এই শব্দের অন্তর্গত।↩
• গভীর নির্জন পথে, ২য় সংস্করণ, অধ্যায়ঃ আপন ঘরে পরের আমি↩
• Karmayogin, Uttarpara Speech↩

Very extraordinary site.
ReplyDeleteThe message here is genuinely valuable.
I will invite my friends here to read this valuable stuff rather than spending time on vibrator dr lee mun heng porn movies. You have earned one constant visitor and a fan of your webiste. Play Online Casino at Cambridge Therapeutics . Thank You and keep posting.